Ad Space

তাৎক্ষণিক

ফেরদৌস সিদ্দিকী-এর গল্প । পটকা

আগস্ট ৫, ২০১৬

তীর্থের কাকের মত বরপক্ষের আগমনের প্রহর গুনছিল এতক্ষণ। বামন দিঘীর পাড় ঘেঁষা পথটা এঁকেবেঁকে এসে ঢুকেছে হলদী ডাঙ্গায়। সে পথ ধরেই এগিয়ে আসছে দশখানেরও বেশি গরুর গাড়ি। সামনের গাড়িতে মাইকে বাজছে গান। ফোটানো হচ্ছে পটকা। সম্ভবত ওটাই বরের গাড়ি। পিঁপড়ার সারির মত এগিয়ে আসে গাড়িগুলো। মুহূর্তেই আনন্দের বন্যা এসে সবাইকে প্লাবিত করে যায়।

‘টেবিলে কেহু হাত দিবি ন্যা, সরবত পইড়্যা যাইবে।’

গাড়ি বহর দেখতে পেয়ে লাফালাফি করছিল ছেলের দল। সবাইকে সাবধান করে দেয় মতি। টেবিলের ওপর ফুলতোলা লাল রঙের টেবিল ক্লথ পাতা। তাতে একটা ট্রেতে করে কিছু মিষ্টি ও সরবত নিয়ে সেই সকাল থেকে গাঁয়ের প্রবেশ পথেই অপেক্ষা করছে মতি ও তার দল। উদ্দেশ্য বরযাত্রীকে মিষ্টি মুখ করিয়ে পয়সা খসানো। গাড়ি বহর যতই কাছে আসতে থাকে ততই ব্যস্ততা বাড়তে থাকে তাদের। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে পিছন থেকে কে যেন ধাক্কা দেয় সোহেলকে। নিজেকে সামলাতে না পেরে গিয়ে পড়ে টেবিলে। মুহূর্তেই উল্টে যায় কয়েকটি সরবতের গ্লাস।

-দিলি তো আকাম কইর‌্যা। এখন সরবত কুনঠে পাবো? অনেকটা ক্ষোভের সাথে বলে মতি। পাশ থেকে মিলন বলে,

-একটা বুদ্ধি আছে?

-কি?

-সিংল্যা কুড়ি থাইক্যা পানি আইন্যা মিশ্যাল কইর‌্যা দি।

-বুঝা যাইবে না?

-একটু কইর‌্যা লাল সরবত গ্যালা মিশ্যাল করলে কেহু বুঝতে পারবে না।

-ঠিক আছে, টপ কইর‌্যা কর।

মতির সম্মতিতে একদৌড়ে গিয়ে জগ ভর্তি পুকুরের পানি নিয়ে ফিরে আসে মিলন। তারপর আগের মতই টেবিলে সাজিয়ে রাখে গ্লাসগুলো। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে সবাই খিল খিলিয়ে হেসে ওঠে।

গাড়ি থেকে তাদের দূরত্ব মিনিট তিনেকের পথ। গমের আটার আঠা দিয়ে রঙিন কাগজ লাগানো দড়িটা নিয়ে এর মধ্যেই পথ আগলিয়ে দাঁড়িয়েছে মতি। বিয়েতে ছোটছেলেরাই করে থাকে এই কাজটি। যথাসময়ে গাড়ি বহর এসে থামে তাদের সামনে। বর এসেছে… বর এসেছে রবে মুখরিত হয় চতুর্দিক। গাড়িতে বসেই বরের দুলাভাই বলে,

-কি গো, তোমরা কি হামরাকে যাইতে দিবা না নাকি?

-মিষ্টি খাইয়্যা হামরাকে খুশি করলেই যাইতে পাইবেন। মতির কথার পিঠে সে আবার বলে,

কই, দেখি টপ কইর‌্যা দ্যাও। গাড়িতে বরকে রেখে নেমে আসে সে, মতি মুখে তুলে দেয় মিষ্টি। মিলন এগিয়ে দেয় সরবতের গ্লাস। তারপর সবাই মিলে এগিয়ে যায় বরের দিকে। নাকে রুমাল চেপে বর গাড়িতে বসা। বরের পরে একে একে তারা সবাইকে মিষ্টি মুখ করায়। তারপর বরপক্ষ সামনে এগুতে গেলেই বাধে বিপত্তি। পিছন থেকে কে যেন বলে ওঠে।

-টাকা না হইলে যাইতে দিব না।

-যাইতে না দিলে তোমারঘেই লস। বরপক্ষের একজন জবাব দেয়। করকরে একশ টাকার একটা নোট মতির পকেটে গুঁজে দিতে হাত বাড়ায় বরের দুলাভাই।

-একশ টাকা লিবো না, এক হাজার লাগবে।

-ঠিক আছে, দু’শ দিছি।

-না, হইবে না।

তিনশ দিবো, এবার ছাড়ো।

-না।

-চারশ দিছি।

ভিড়ের মধ্য থেকে সোহেল বলে ওঠে,

-দুলাভাইরা ফকির হইয়্যা গেছে, এমনি যাইতে দিয়্যা দে। গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে মতি। কয়েকজন মুরব্বিও বলেন পথ ছেড়ে দিতে। কিন্তু সে কিছুতেই রাজি হয় না। অবশেষে একটা পাঁচশ টাকার নোট হাতে পাওয়ার পর পথ ছাড়তে রাজি হয় মতি ও তার দল। বিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় গাড়ি বহর।

মতির বড় বোন পরশমনি। গোপালপুরের বাসিন্দা তমিজ উদ্দীনের বড় ছেলে মফিজের সাথে আজ তার বিয়ে। বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজন। যে যার কাজে ব্যস্ত। বিয়ে পড়ানোও শেষ। নতুন গামছায় ভর্তি বাতাসা সবার মধ্যে বিতরণ করেন সামা নানা। বরযাত্রী জুম্মার নামাজে শরিক হতে মসজিদে যায়।

নামাজ শেষে ফিরতে শুরু করেছে, কেউ কেউ, তারপর শুরু হয় খাওয়া-দাওয়া। মতিদের খলাতে শামিয়ানা টাঙানো। নিচে সাজানো সারি সারি বেঞ্চ। প্রথমে বরপক্ষ, তারপর আত্মীয়-স্বজনদের খাওয়ার পর্ব শেষ। পান চিবুতে চিবুতে বৈঠকখানায় বালিশে হেলান দিয়ে খোশ গল্পে মেতে ওঠে কেউ কেউ।

বেলা পড়ে আসে। ফেরার কথা ভাবতে শুরু করে বরপক্ষ। তবে এখনো কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়ে গেছে। ভেতর বাড়িতে ছেলের দল ব্যস্ত রঙ মাখামাখিতে। হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণের মত শব্দ আসে কানে। সবাই চমকে ওঠে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হৈ চৈ পড়ে যায়। ডান হাতটা চেপে ধরে আর্তনাদ করে মাটিতে বসে পড়ে মতি। কি হয়েছে… বলে চুলায় রান্না ফেলে ছুটে আসে মতির মা। পরক্ষণে আসে বাবা, বোন আরো অনেকেই। মতিকে মারতে উদ্যত হয় তার বাবা। পিছন থেকে কে যেন ধরে ফেলে। বালতি ভর্তি পানি এনে ছোট চাচি দগ্ধ হাতটা তাতে ডুবায়। ভাটা পড়ে আসে আনন্দ উচ্ছ্বাসে।

কিছুক্ষণ পর বর-বউকে আঙিনায় বসিয়ে সবাই মিলে মজা করে। দূর থেকে সুবোধ বালকের মত চেয়ে চেয়ে দেখে মতি। একে একে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে আসে। ঘনিয়ে আসে বিদায় মুহূর্ত। মেয়েকে জামাতার হাতে তুলে দেয় মতির বাবা। যাবার বেলায় কান্নার রোল পড়ে। এক এক করে মা, চাচি, খালা, দাদি-নানি সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে পরশমনি। চোখের পানি মুছতে মুছতে মাকে জিজ্ঞেস করে,

-মতি কুনঠে আছে?

-ঐঠে। বারান্দার কোণে পাতা চৌকির দিকে নির্দেশ করে জবাব দেয়। পরশমনি ছুটে যায় ভাইয়ের কাছে। একশ টাকার একটা নোট হাতে ধরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-কিভাবে হাতখানা পুড়ালছিস? দগ্ধ বুড়ো আঙুলটার দিকে তাকিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে মতি বলে,

-পাঁচটা ভট্কা ভাইংগ্যা একটা বড় ভটকা গড়ালছিনু। ফুটার সময় হাতে লাইগ্যা থাকা বারুদ গ্যালাতে ধপকইর‌্যা আগুন ধইর‌্যা গেছে…।

পিছন থেকে ডাকাডাকি শুরু করায় বেশি কিছু বলার সুযোগ পায় না সে। ভাইকে একা রেখে ফিরে আসে পরশমনি।

গাড়িতে উঠে বসে বরযাত্রীরা। ভিতর বাড়িতে কেউ নেই। সবার পরে মতিও বের হয়ে আসে। গাড়ি বহর ফিরতি পথে পা বাড়ায়। পটকা ফুটাতে ফুটাতে দূর গাঁয়ের আড়ে হারিয়ে যায় এক সময়, উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মতি।

অলংকরণ : আইয়ুব আল আমিন