Ad Space

তাৎক্ষণিক

তরুণ শিল্পীদের নিরীক্ষার চোখ

জুলাই ৩০, ২০১৬

সাহেব-বাজার ডেস্ক : স্পেনে অবস্থিত আলতামিরা গুহায় একটি বাইসনের যে চিত্রকর্ম আদি মানুষের শিল্পবোধ নিয়ে আজো আমাদের ভাবিয়ে তোলে, তাতে স্পষ্ট করে বলা যায়, মানুষ তার সৃজনশীল চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর যে চেষ্টা করে আসছে, তার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। সে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দিন যত গেছে মানুষ তার এ শিল্পবোধকে আরো শানিত করেছে নানা নিরীক্ষার মাধ্যমে। আজো যা চলমান। সে চলমান শিল্পযাত্রার অংশ হিসেবে ধানমন্ডির জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠের উন্মুক্ত স্টুডিওতে চলছে নির্বাচিত ১০ তরুণ শিল্পীর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী।

২৩ জুলাই শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর একটি বিশেষ দিক হলো ‘ওপেন স্টুডিও’ ধারণা থেকেই এমন আয়োজন। যেখানে শিল্পীরা অন্যান্য প্রদর্শনীর মতো একেবারে তাদের পূর্ণাঙ্গ কাজ নিয়ে হাজির হননি। চারপাশ সব কিছুই যেমন একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন, কোনো কিছুরই পূর্ণাঙ্গ রূপ নেই, তাদের কাজগুলোও বলা চলে ঠিক তেমনই। তাই তো কোনো শিল্পকর্মের পরিপূর্ণ কাঠামো বা অর্থ সেভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর এই না পেয়ে খুঁজে বেড়ানোটাই হয়তো এই ওপেন স্টুডিওর উদ্দেশ্য। যেখানে এসে শিল্পানুরাগীরা তাদের চিন্তাকে উন্মুক্ত করবেন ঠিক শিল্পীর মতোই এক নিরন্তর সন্ধানের মাধ্যমে।

সেদিন প্রদর্শনীর উদ্বোধনের পাশাপাশি ‘আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার’ প্রদান ও এই ওপেন স্টুডিওর উদ্বোধনও করা হয়। প্রদর্শনীতে ড্রইং, ভিডিও আর্ট, আলোকচিত্র, ভাস্কর্য, ছাপচিত্র ও পারফরম্যান্স এই বিষয়গুলোর ওপর সেরা ১০ জনের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্য থেকে পুরস্কার পেয়েছেন তরুণ শিল্পী রাজীব দত্ত ও মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।

রমিজ নামের এক কাল্পনিক চরিত্রকে সামনে এনে সমসাময়িক রাজনীতিকে একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন শিল্পী রাজীব দত্ত তার ড্রইং আর বক্তব্য দিয়ে। তার আঁকা প্রতিটি চিত্রকর্মে একেকটি গল্প তিনি নিজ হাতে লিখেছেন। চিত্রকর্মের গায়ে এমন গল্পে গল্পে বক্তব্য উপস্থাপন ভিন্ন এক ভাবনার জগতে নিয়ে যাবে আপনাকে। যেখানে রমিজকে দেখা যায় পলাশীর আম্রকানন প্রান্তরে ১৭৫৭ সালের কোনো একদিন লর্ড ক্লাইভের কাছে ‘নুন আর মরিচের ইজারা’ দিয়ে সিরাজের সঙ্গে গাছের আম গুনতে ব্যস্ত। হয়তো এ পলিটিক্যাল স্যাটায়ারের মাধ্যমে ইতিহাসের ভুলগুলোই তিনি তুলে আনতে চেষ্টা করেছেন। আবার বর্তমান সময়কে তিনি ধরতে গিয়ে নাগরিক যান্ত্রিকতা, মানুষের মেকি শিল্পবোধ ইত্যাদিও তুলে এনেছেন। এমনকি গুম হয়ে যাওয়া কল্পনা চাকমার কথাও উঠে এসেছে তার অ্যাবস্ট্রাক্ট ঢঙের চিত্রকর্ম আর লেখনীতে।

শিল্পী রাজীব দত্তের কাজ নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের শেষ থেকে এ কাজগুলো করা শুরু করি। আমি রাজনীতিটাকে একটু ভিন্নভাবে বলতে চেয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধানের কথা বলিনি। প্রতিদিন যা দেখি বা আমার চারপাশে যা ঘটে, সেটিরই একটি বহিঃপ্রকাশ বলব একে।’ প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজই পূর্ণাঙ্গ নয় কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। আবার অপূর্ণাঙ্গ মনে হলেও প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া শিল্পীদের প্রত্যেকের কাজের মধ্যে একটি অন্তমিল খুঁজে পাওয়া যাবে।’ তরুণ শিল্পীদের জন্য এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের যথাযথ সম্মান করাটা খুব জরুরি। তো এমন আয়োজন শিল্পীদের আরো উৎসাহিত করবে।’

পুরস্কারপ্রাপ্ত আরেক শিল্পী রফিকুল ইসলাম শুভর পাশাপাশি দেয়ালে দুটি ভিন্ন গল্পের ভিডিও আর্টে দেখা যায় শহর আর গ্রামের গল্প। একটিতে গ্রামীণ সাধারণ জীবনযাপনের অনুসন্ধান, অন্যটিতে কল্পনায় এ শহরে বাস করা কোনো এক নারীর গল্প তিনি বলতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে যে নারী একজন নয়, অগণিত। দর্শক তার নিজস্ব ভাবনা নিয়ে যেন বেরোতে পারে, সেজন্য ভিডিও আর্টে তিনি যে শুধু কিছু দৃশ্য ধারণ করেছেন এমন নয়, ভিডিওর সঙ্গে ছিল বাক্যের ব্যবহার।

প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া আলোকচিত্রী শামসুল আলম হেলাল তার আলোকচিত্রে তুলে এনেছেন ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের বাস্তব ছবি। সমাজে অচ্ছুত বলে যাদের গণ্য করা হয়, তারাও যে সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়, সে কথাই উঠে এসেছে শামসুল আলম হেলালের আলোকচিত্রে। আর পলাশ বরণ বিশ্বাসের ছাপচিত্রে দেখা যায় একজন বোরখা পরিহিত নারীর গিটার বাজানোর দৃশ্য। যে দৃশ্য বর্তমান অস্থির সময়ে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মীয় মূল্যবোধ আর শিল্প সাধনা এ মাটিরই। নারী, ধর্ম আর সংস্কৃতি কোনোটিই একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। এছাড়া শাহনাজ জেরিন সাত্তার ও আলী আজগরের পারফরম্যান্স, জিহান করিম ও পলাশ ভট্টাচার্যের ভিডিও আর্ট আর সালমা আবেদিন পৃথীর আলোকচিত্র ও রুপম রায়ের স্থাপত্যকর্মেও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প আর ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার কথা। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১ থেকে সন্ধ্যা ৭টা।

উল্লেখ্য, যে আমিনুল ইসলামের নামে এ পুরস্কারের প্রবর্তন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের একজন স্বনামধন্য চিত্রকর। এ শিল্পী মৃত্যু অবধি বিশ্বাস করতেন নবীন প্রজন্মের শিল্পীদের নবনিরীক্ষার মধ্য দিয়েই দেশের চিত্রশিল্পের ধারা সঞ্জীবিত হয়ে উঠবে। শিল্পীর সে ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তার পরিবারের পক্ষ থেকে ২০১৩ সালে ‘আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার’ প্রবর্তন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক বছর ধরে তরুণ শিল্পীদের এ পুরস্কার দেয়া হয়