Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • রাজশাহী হবে ভিন্নধর্মী মহানগরী: বাদশা– বিস্তারিত....
  • বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা– বিস্তারিত....
  • পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর গুলিতে দুই ভারতীয় সেনা নিহত– বিস্তারিত....
  • ফেইসবুক প্রোফাইল পিকচার ডাউনলোড পদ্ধতি বন্ধ– বিস্তারিত....
  • মোহনপুরে সড়ক দুঘর্টনায় গবেষক মনসুর নিহত– বিস্তারিত....

গুপ্তহত্যা রাজনীতির মূল নায়ক জামায়াত-শিবির । ফজলে হোসেন বাদশা

জুলাই ১৪, ২০১৬

বাংলাদেশে সম্প্রতি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে আইএস (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া-আইএসআইএস) রাজনীতির শিক্ষা থাকলেও তারা কেউই সরাসরি ওই আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত নন বলে মনে করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। দেশে আইএসের উপস্থিতি আছে বলেও মনে করেন না এই বামপন্থী নেতা। তার মতে, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মদদে জামায়াত দেশে গোপন বাহিনী গড়ে তুলে গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে।

এমরান হোসাইন শেখকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাবেক ভিপি ও বর্তমান সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এ সব কথা বলেন। সাক্ষাৎকালে তিনি ক্ষমতাসীন সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা ও ১৪ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন।

বর্তমান সরকারের সার্বিক কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ফজলে হোসেন বাদশা :  বর্তমান সরকারের সার্বিক কার্যক্রমকে আমরা ইতিবাচক বলেই মনে করি এই অর্থে যে, সরকার তার প্রতিশ্রুত মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার করছে। সেই বিচারের রায়ও কার্যকর হচ্ছে। দ্বিতীয় হলো, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, সেটাও এ সরকার রাজনৈতিকভাবে স্বীকার করে। এটাকেও আমরা একটা অর্জন হিসেবেই মনে করছি। যদিও এ ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা আছে। এখানে অবশ্য সমালোচনার অনেক জায়গা রয়েছে। কারণ, পঞ্চদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম করার বিষয়টিতে আমরা সমর্থন করিনি। এর ফলে সংবিধানে বিশাল একটি অসঙ্গতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে অন্য সব ক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া সরকারের সব থেকে বড় সাফল্য হলো, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট দুই টার্ম ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু তারা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে তেমন কোনও ভূমিকা রাখতে পারেনি। সে বিবেচনায় বর্তমান সরকার টানা দুই টার্ম যে ক্ষমতায় আছে, এ সময়ে দেশের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে। তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে। এটা নিঃসন্দেহে সরকারের বড় সাফল্য।

সরকারের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে, আর্থিকখাতের দুর্নীতি, লুটপাট ও দেশ থেকে বিশাল অংকের অর্থ বিদেশে পাচার ও শিল্পখাতে অগ্রগতির ধীরগতি। দেশ অর্থনৈতিকভাবে যতটা এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো, এই বিষয়গুলো সেটাকে অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত করছে।

১৪ দলীয় জোট কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে বলে আপনি মনে করছেন?

ফজলে হোসেন বাদশা : আপনারা জানেন, ১৪ দল গঠনে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। জোটের কথা বলতে গেলে আমাদের একটু পেছনের দিকে যাওয়া দরকার। আমাদের দেশের জোট রাজনীতির ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হচ্ছে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে গঠিত যুক্তফ্রন্ট এবং আশির দশকের শেষে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে গঠিত পাঁচদল, সাতদল ও ১০ দলীয় জোট। জোট রাজনীতিতে এই দুটি সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো যতটা সক্রিয় ছিল, ১৪ দল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর রাজনৈতিকভাবে সেই ধরনের সক্রিয়তা দেখাতে পারেনি।

দেখুন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিষয়টি। এই নির্বাচন না হলে কিন্তু আমাদের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হতো না। অথচ ক্ষমতায় থেকেও এই নির্বাচনে ১৪ দল দাবি করার মতো কোনও অবদান রাখতে পারেনি। ওই সময় সরকারকে পুরোপুরি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভর করে সরকারকে ওই নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে হয়েছে। অথচ এই নির্বাচনে ১৪ দলেরই দরকার ছিল রাজনৈতিকভাবে শক্ত ভূমিকা পালন করার। সেখানে আমরা সফল হতে পারিনি। ওই সময় ১৪ দল সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারলে নির্বাচন নিয়ে কিন্তু বিতর্ক তৈরির সুযোগ হতো না।

জোটকে আরও শক্তিশালী করা বা সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করতে চান?

ফজলে হোসেন বাদশা : ১৪ দল চর্চার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না আওয়ামী লীগ। প্রধান শরিক হিসেবে এক্ষেত্রে তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের কথা ছিল। সরকার অনেক সময় অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। সেটা নিয়ে ১৪ দলে আলোচনা হয় না। এর অর্থ হলো, সরকার নিজেকে ১৪ দলের সরকার হিসেবে মনে করে না। অথচ এসব ইস্যুতে জোটে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি বিষয় থাকতে পারতো। তা না করার কারণে সরকারের সঙ্গে ১৪ দলের এবং জনগণের বিচ্ছিন্নতা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে জোটসম্পৃক্ত দলগুলো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে দুর্নীতি হচ্ছে।

এক্ষেত্রে দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত সদ্যসমাপ্ত ইউপি নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতীকের বিষয়ে নির্বাচনের বিষয়টি ১৪ দলে কোনও আলোচনা করাই হলো না। সরকার নিজে থেকে এই সিদ্ধান্তটা নিলো। অথচ এই সিদ্ধান্তের আগে এটা নিয়ে আলোচনা করলে নির্বাচনটা আমরা কীভাবে করবো, সে বিষয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা যেতো। ফলে, নির্বাচন নিয়ে আজকের বিতর্কটা উঠতো না এবং এত প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতো না। আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে আওয়ামী লীগ প্রতীকে নির্বাচন করতে গিয়ে তাদেরই কিন্তু বেশি ক্ষতি হয়েছে। দেখা গেছে, নির্বাচনে যে অরাজকতা ও সংঘর্ষ হয়েছে, তাতে তাদের প্রাণহানিও বেশি হয়েছে। কাজেই, আওয়ামী লীগ ১৪ দলকে উপেক্ষা করার জন্য নিজেরাও কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

আমরা সরকারের সঙ্গে আছি। কিন্তু ক্ষমতায় নেই। আর জামায়াত-বিএনপি যাতে এদেশে ক্ষমতায় আসতে না পারে, তার জন্যই আমরা সরকারের সাথে আছি।

সম্প্রতি গুপ্তহত্যা বা সন্ত্রাসী হামলা প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কী?

ফজলে হোসেন বাদশা : প্রায় বছর দুয়েক হতে চললো এই ধরনের চোরাগোপ্তা হামলা বেড়ে গেছে। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিন্দা জানানো ছাড়া জোটে বিস্তারিত আলোচনা আগে-পরে  কখনো হয়নি। আওয়ামী লীগ এ বিষয়টি ১৪ দলে আলোচনা করার প্রয়োজনও বোধ হয়ত করেনি। ফলে, এ গুপ্তহত্যাগুলো ১৪ দল সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে পারছে না। এসব গুপ্তহত্যা যারা করছে, তারা যে খুব বড় শক্তি, সেটা আমরা মনে করি না। কারণ, আপনারা  ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখবেন দুর্বল শক্তিই সব সময় চোরাগোপ্তা হামলা রচনা করে থাকে। আমার মত হচ্ছে, মূলত এটা জামায়াত করছে বা তাদের দিয়ে এগুলো করানো হচ্ছে।

আপনারা হিসাব করলে দেখতে পারবেন, এ পর্যন্ত যত জঙ্গি গুপ্তহত্যাকারী সন্ত্রাসী আটক হয়েছে, এসব হামলা বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার না করলেও তারা এটা স্বীকার করেছে যে, কোনো না কোনোভাবে জামায়াতের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। হয় এখন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত আছে, না হলে আগে কোনো না কোনো সময়ে তাদের রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাস করতো।

এ থেকে বোঝা যায়, জামায়াতের সম্পৃক্ততা রয়েছে। জামায়াত বর্তমানে গোপন বাহিনী গড়ে তুলেছে এসব চোরাগোপ্তা হামলা পরিচালনা করার জন্য। আর এতে পাকিস্তানের মদদ আছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশের মদদও থাকতে পারে। এর সাথে আইএসের রাজনীতির শিক্ষা থাকতে পারে। তবে আইএসের উপস্থিতি আছে বলে আমি মনে করি না। আমার কথা হলো, সামগ্রিকভাবে গুপ্তহত্যা রাজনীতির মূল নায়ক জামায়াত-শিবির। এ সম্পর্কে বিএনপিও অবগত।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সৌদি সরকার কিন্তু সমগ্র পৃথিবীতে মুসলিম সমাজকে বিভক্ত করার জন্য দায়ী। তারা মুসলমানকে শিয়া-সুন্নিতে বিভক্ত করেছে। বাংলাদেশে ওহাবী ও সুফিবাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত বাড়িয়েছে। আর আমেরিকার সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় অভিযান চালিয়েছে। তাদের কারণে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তাই, আমি বলবো, মুসলিম বিশ্বকে বারবার বিভক্তকারী সৌদি সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন কাবা শরীফে বাংলাদেশি সেনা পাঠানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

হেরেম শরীফের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটবে আর সেই সব অপকর্মের পাহারাদার হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করার অধিকার বর্তমান সরকারের নেই। আমার মত হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বাইরে আরব বিশ্বের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত হবে না।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদকে নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা বিরূপ মন্তব্য করছেন। বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

ফজলে হোসেন বাদশা : জাসদ নিয়ে আওয়ামী লীগ অসহিষ্ণুতা কেন, এটা আওয়ামী লীগকেই ব্যাখ্যা করতে হবে। আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে, সেটা তো স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ থেকেই তো একটি অংশ বেরিয়ে এসে জাসদ গঠন করে। আর এটা জেনেশুনেই জাসদকে তারা ১৪ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্ত করে। আজকে জোট গঠনের একযুগ পর তাদের জোটে ও মন্ত্রীত্বে রেখে এ ধরনের তীব্র ও উলঙ্গ সমালোচনা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা তাদেরই জানাতে হবে। জাসদের রাজনীতি নিয়ে যদি চর্চার প্রয়োজন থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের দলীয় ফোরামে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রকাশ্যে এনে জোট রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন যদি কোনো আওয়ামী লীগ নেতা ১৪ দলকে বিভক্ত করে, তাহলে তারা প্রধানমন্ত্রীকে কতটা অনুসরণ করেন, সে প্রশ্নই তো এসেই যায়! পাশাপাশি আমরা যখন ১৪ দল সম্প্রসারণের কথা ভাবি, তখন অভ্যন্তরীণ বিতর্ক সৃষ্টি কতটা যুক্তিসঙ্গত, সে প্রশ্নটাও কিন্তু চলে আসে।

আমার অভিমত হচ্ছে, এই বিতর্কে সাঙ্গ দিয়ে আগামী দিনগুলোতে ১৪ দলের করণীয় ও আমাদের প্রতি জনগণের যতটুকু আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনার জন্য কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে বিতর্কে সক্রিয় হওয়া।

স্বাধীনতা পরবর্তী জাসদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, জাসদের ওই সময়কালের ভূমিকা নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি কখনোই দলীয়ভাবে মূল্যায়ন করেনি। কাজেই তাদের ভূমিকার বিষয়টি আমাদের কাছে বিস্তারিতভাবে নেই। কাজেই আনুষ্ঠানিকভাবে এটা নিয়ে দলের ভেতর থেকে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জাসদ আমাদের সহযাত্রী হতে পারে, এটা আমরা এখনো বিশ্বাস করি।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন