অক্টোবর ১৯, ২০১৭ ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

Home / slide / স্মৃতি সততই সুখের নয় । হাসান আজিজুল হক
স্মৃতি সততই সুখের নয় । হাসান আজিজুল হক
স্মৃতি সততই সুখের নয় । হাসান আজিজুল হক

স্মৃতি সততই সুখের নয় । হাসান আজিজুল হক

বেশ ক’বছর আগে স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, দৌহিত্র, কন্যা ও বড় বোনকে নিয়ে এক বার বেশ দল বেঁধে রাঢ়ের বর্ধমান জেলায় যবগ্রামে এসেছিলাম। তখন অবশ্য দেখেছিলাম, আমার শৈশবের গ্রামটি অনেক বদলেছে। তার পরেও মনে হয়েছিল, বদল যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, মূল গ্রামটির আমূল কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। বেশ মনে পড়ছে, গ্রামের খুব লাগোয়া যে বড় দিঘিটি ছিল, সেটি আগের মতো জলে টইটম্বুর ছিল না বটে, কিন্তু চেনা যাচ্ছিল তাকে। তার পাশের আর একটি বড় জলাশয়, যাকে আমরা বলতাম ‘তামিল পুকুর’, সেটিও দেখেছিলাম একই রয়েছে। তার উত্তরে অনেকগুলো তেঁতুলগাছ, পুবের ঘাটে বাজ-পড়া মুন্ডুহীন তালগাছটা, উত্তর পারের কয়েতবেল, বহেড়া আর দুটো-তিনটে বাবলাগাছ আগে যেমন দেখেছিলাম, তেমনই রয়েছে। তাদের ভিতর দিয়ে যে মানুষ চলাচলের পথ ছিল, সেই পথ ধরে সে দিন মাঠে নেমে গিয়েছিলাম। অঘ্রান মাসের তখন শেষ। ধান কাটা সবে শুরু হয়েছে। কিছু আঁটি বাঁধা হয়েছে, কিছু তখনও রোদে শুকোচ্ছে। ভরদুপুরে সেই আঁটিবাঁধা ধানগুলির উপরে শুয়ে যে অসম্ভব সুন্দর নীল আকাশটা দেখেছিলাম, সেটা আজও কেন মনে আছে জানি না। বিশাল ফাঁকা মাঠের একটি সাত বিঘা জমিতে যে প্রচুর ধান ফলেছে, সেখানে শুয়ে থাকার, আর ওই ঝকঝকে রোদের দুপুরে আকাশের গভীর নীলিমা দেখার আনন্দটা এখনও মনে আছে। এ সব হয়তো পশ্চিমবাংলার চিরকেলে রূপ। কখনও বদল হবে না।

কিন্তু এ বার গিয়ে মনে হল, পুরনো গ্রামটিকে আর যেন চিনতে পারছি না, আমাদের ছোটবেলার বিরাট একান্নবর্তী পরিবার এখন টুকরো টুকরো হয়ে নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে ঢুকতেই বোঝা গেল মানুষ বেড়েছে, স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। গ্রামের বাইরে, মাঠের দিকে দিঘির পাড়ে আলু-আখ-কুমড়ো লাগানোর জন্যে যে-সব জমি ছিল, সেগুলো ঘর-বাড়িতে ভরে গেছে। এমনকী যে ফুটবল খেলার বিরাট মাঠ ছিল, তাকে চারিপাশ থেকে আবাদি জমি ঘিরে ধরেছে। গরু-মোষ গ্রামে প্রায় নেই বললেই চলে। কাজেই গরুর গাড়িও নেই। চাইলেই ‘কার’ বা ‘মাইক্রোবাস’ পাওয়া যাবে।

গ্রামের যে কাঁচা সড়কটি ধুলো-কাদায় ব্যবহারযোগ্যই থাকত না, সেই রাস্তাটি এখন পাকা। রেল স্টেশন ‘নিগণ’ থেকে যে কাঁচা সড়কপথটি চলাচলের অযোগ্য ছিল, জায়গায় জায়গায় ভাঙা– কাদা ভরা; গরু-মোষের গাড়ি প্রায় সম্পূর্ণ পুঁতে যেত, সেই ভাঙাগুলি আর নেই। আগে ছিল মোরাম-মোড়া, এ বার দেখলাম পিচঢালা পথ। বৃদ্ধি ঘটেছে, সঙ্গে সঙ্গে পতনও। গ্রামের মুখের বড় দিঘিটা প্রায় শুকিয়ে গেছে। গ্রামের ভিতর যে-সব কাকচক্ষু স্বচ্ছ জলে পুকুর ও দিঘিগুলি পরিপূর্ণ ছিল, কী করে সেগুলো এমন শ্রীহীন জলশূন্য হয়ে গেল, জানি না। মাটির বাড়িতে ভরা সেই গ্রামটাতে এখন এখানে-সেখানে বড় বড় পাকা বাড়ি, শক্ত থাবায় গাঁ-টাকে আটকে ফেলেছে।

পাতলা সিল্কের চাদরের মতো এক রকম রুটি বানানো হয়, যার দশটা একসঙ্গে খাওয়া যেত। ‘সেমাই’ তো মুসলমানেরা বাড়িতেই তৈরি করত। এক সময় মেয়েরা বাড়িতে বসে বসে হাতেই তৈরি করত সেমাই। পরে একটা কল বেরলো, যাতে সরু মোটা নানা রকম সেমাই তৈরি করা যেত। অদ্ভুত ব্যাপার, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে এ ধরনের পিঠে হত না।

নতুন মাটির বাড়ি প্রায় নেই। পুরনোগুলো যে-কোনও সময় ধুলোয় মিশে যাবে বলে যেন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। গ্রামের কাদাভরা রাস্তাগুলোর বেশির ভাগই পাকা হয়ে গেছে দেখছি। ধ্বংস আর শ্রীবৃদ্ধির এমন বিপরীত ছবি কী করে সম্ভব হল, জানি না। পোড়ো মাটির ঘরে মোবাইল থেকে আরম্ভ করে সব আধুনিক প্রযুক্তির জিনিস, যা আমাদের সময়ে কল্পনাতীত ছিল। এই সব নিয়ে গ্রামের অশিক্ষিত লোকেরা যেমন, তেমনই ডিগ্রিপ্রাপ্ত যুবক-যুবতী বেকার বসে আছে। এর আগে শুনেছিলাম সারা রাত ধরে সংকীর্তন, এ বার মাইকে একই সুরে কী যে মাথামুন্ডু গান শুনলাম, কিছুই বোধগম্য হল না। শুনলাম, যোগাদ্যা পুজো উপলক্ষে মুচিপাড়ায় এই সব গান শোনানো হচ্ছে। এরই মধ্যে কখনও কখনও ‘ও পলাশ, ও শিমুল’ বা ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’– তাও শোনা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের শস্যাগার হিসেবে যে বর্ধমান পরিচিত, সেখানে এখন গরু-মোষের চাষ নেই। মেশিনে চাষ, মেশিনে ধান কাটা, মেশিনে ধান ঝাড়া। গরু-মোষ নেই, কাজেই বড় বড় খড়ের পুরও নেই। খড় মাঠেই পড়ে থাকে। ধান সবই বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রায় সব গৃহস্থই চাল কিনে খান। অবাক হলাম শুনে, নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্যে দু’টাকা কিলো চালের দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সবাই তাই চাল কিনে খান। রেশন কার্ডের শুভঙ্করের ফাঁকি কেউ ধরতে পারে না।

এই অদ্ভুত সামাজিক অবস্থার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেও আমি থই পাচ্ছি না। গ্রামের স্কুলটার পুরনো ভবনটি ভেঙে একটা নতুন দোতলা ভবন তৈরি হয়েছে। বড় দিঘিটাকে খুন করে, লম্বা মাটির বোর্ডিং ঘরগুলোকে ভেঙে, তার জায়গায় বিরাট একটি ‘জিমনেসিয়াম’ তৈরি হচ্ছে। এই নতুন স্কুলের সামনে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর একটি ভাস্কর্য মতো করে ছোট্ট একটা খাঁচায় আটকে রাখা হয়েছে। তার মানে হচ্ছে, ‘নাই নাই নাই’– আর কত কী যে আছে তার অন্ত নেই। দুটোই সত্য।

শিবতলার সুন্দর প্রশস্ত জায়গাটি ছোট হয়ে এসেছে। তার পাশের বিশাল দু’টি অশ্বত্থ গাছের একটিকে কেটে ফেলা হয়েছে। পালেদের বাড়ির পাশের যে তেঁতুলগাছটা ছিল, সেটি অদৃশ্য। তার পাশেই ওদিকে কাঁচকিতলায় আর একটি যে বড় তেঁতুলগাছ ছিল, দলছুট কোনও হনুমান গাঁয়ে এসে পড়লে ওই তেঁতুলগাছটাতেই বসত। কখন যে লাফ দেবে, এ-বাড়ি ও-বাড়ির ঘরের চালে ঝাঁপিয়ে পড়বে! একটা-দুটো ফল-পাকুড় নিয়ে আবার তেঁতুলগাছে এসে বসবে। আহা! সেই তেঁতুলগাছটির এখন কী জীর্ণ দশা!

গ্রামের পথে কেন যে এত কম মানুষজন, তা বুঝতে পারলাম না। যে দু’চার জনকে দেখলাম, কাউকেই চিনি না। আমার পাঠশালার জায়গাটি একই রকম আছে, কেবল পাঠশালাটি নেই। একমাত্র কালীঠাকুরের খড়ের কাঠামোটা কালের প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হল। এখনও পুরুষানুক্রমে কালীপুজো চলছে। পুরনো যে দু’চার জনের সঙ্গে দেখা হল, তারা সামনে এসে দাঁড়ানোর পর আমার সঙ্গী নাম বলে দিলে তবে চিনতে পারলাম। একেবারে কঙ্কালের উপর জীর্ণ চামড়ার আবরণ। চোখের চাহনিতে কী যে আছে, আমি কিছুতেই বলতে পারব না। কেন আসি? বার বার কেন আসি! জানি না। হাহাকারের ধুলো উড়িয়ে বয়ে যায়, তার ঝাপটা এসে গায়ে লাগে। আর মনে হয়, কী প্রচণ্ড টান নিয়ে এখানে এসে এই রকম বিমুখতার সামনে পড়তে হয়।

মাসি এখনও বেঁচে আছেন, আছে খুড়তুতো ভায়ের পুত্ররা আর তাদের ছেলেমেয়েরা। এই একটি মাত্র সংসারে যাওয়া গেল। আমাদের বিশাল বংশের আর কারও বাড়ি-ঘর চেনা গেল না। মূল ভিটের উপর থাকলেও, যে বাড়িতে আমার বড় হয়ে ওঠা, যে বাড়ির স্বপ্ন আমি বার বার দেখি। স্বপ্নেই যেন চেঁচিয়ে উঠি, আহ্, এই যে আমার বাড়ি! বিরাট তার উঠোন, অবিশ্বাস্য একটা মাটির বাড়ি– তিনতলা; এখনও সেখানে আর এক জনের বসতবাড়ি, অন্য পাশে গরুর গোয়াল। এ বার এক বার মাসির কাছে যেতেই হয়। একেবারে ঝুরি-ঢাকা বৃদ্ধা। চুরানব্বই বছর বয়স হবে। আমি যেতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আমাদের দেশের সেই প্রথাসিদ্ধ কান্না শুরু করলেন। এটা বিশেষ ভাবে আমার প্রয়াতা স্ত্রীর জন্যে। তিনি তাঁকে তাঁর খুব ছোটবেলায় কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিলেন, ইনিয়ে-বিনিয়ে সেই সব কথা। জানি, ওই কান্নার মধ্যে এতটুকু খাদ নেই। কিন্তু এও জানি, এটাই রীতি; কাঁদতেই হবে। না কাঁদলে নিন্দা জুটবে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার। প্রাণের আর প্রথার কান্না একসাথে।

কেউ কি বিশ্বাস করবে যে কান্না শুধুই অশ্রুপাত নয়। তার বাণী, গায়কি, সাহিত্যের মধ্যে রকমফের আছে। পুরুষরাও কাঁদে বটে, তবে তার তেমন প্রকারভেদ নেই। দক্ষতা, নৈপুণ্য আর যোগ্যতার দিক থেকে মহিলারাই সামনে থাকবেন। সম্প্রদায়গত ভাবে কান্নাতে যেমন আলাদা ধরন আছে, ব্যক্তিবিশেষেও, কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে সম্প্রদায়গত ভেদ ও ব্যক্তিগত ভেদ দুটোই আছে। সুর আর কথা একেবারেই আলাদা। হিন্দু মহিলাদের কান্না বাণীপ্রধান। অনেকগুলো কথা বলে নিয়ে তার পর টানা কান্না। মুসলিম মহিলারা অত বাণীর ধার ধারে না। তারা দুটো-একটা কথার সঙ্গে বিকৃত স্বর প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত থাকে। উভয় ক্ষেত্রেই অশ্রুর পরিমাণ সামান্য। পুরুষরা যেমন চোখ পিটপিট করে খানিকটা জল বার করার চেষ্টা করে, মহিলারা সেখানে অনর্গল অশ্রুবর্ষণ করে যেতে পারে। আমি অন্তত মুসলমান সমাজের কথা জানি, যেখানে কান্নার নানা প্রকারভেদ আছে। আমি আমার অতি নিকটজন, মা-কাকিদের কথা বলছি। ধরা যাক, এক দিন সকালে উঠে দেখছি মায়ের মনটা খুব ভার, কাজকর্ম ঠিকই করছেন, কিন্তু বড়ই চুপচাপ। বড় কড়াইয়ে বেশ কিছুটা নুনজল দিয়ে মুড়ির চালটাকে বেশ মাখিয়ে নিলেন, তার পর চালটাকে ভাজার উপযুক্ত করার জন্য কাঠের হাতা দিয়ে ক্রমাগত নাড়তে শুরু করলেন। ঠিক এই সময়ে শুনতে পাওয়া গেল খুব মৃদু একটা ‘হু’ ‘হু’ আওয়াজ। আমরা তখনই বুঝে যেতাম, আজ মায়ের কাঁদবার দিন এসে গেছে। কেউ অবাকও হতাম না, বিরক্তও হতাম না, বা ছুটে গিয়ে কান্না থামাবার চেষ্টাও করতাম না। সবাই জানত, এটা দ্বিমাসিক বা হতে পারে ষাণ্মাসিক কান্নার দিন। ও দিকে ‘হু’ ‘হু’ শব্দ আস্তে আস্তে বাড়ছে। গোটা বাড়ির মানুষই এখন শুনতে পাচ্ছে এই কান্না। কিন্তু সবাই নিশ্চেষ্ট। পুরুষরা একেবারে নির্বিকার, স্বাভাবিক কাজকর্মে লিপ্ত, কেউ বিরক্ত হচ্ছে না। কান্না এ বার গোটা বাড়িতে শোনা যাচ্ছে। কেন এই কান্না! কেউ জিজ্ঞাসাও করে না। যেন বুকের ভিতর পাষাণ চাপা ছিল, এখন স্বাভাবিক গৃহকর্মের মধ্যে সেই পাষাণ গলতে শুরু করেছে। দশ থেকে পনেরো মিনিট চলল চিৎকার করে এই কান্না। এর মধ্যে বাণী তেমন কিছু নেই, দু’একটি শব্দ কেবল ধরা যায়, বাকিটা পুরোপুরি গলার কাজ। চাল এখন মুড়ি ভাজার উপযুক্ত হয়ে গেছে। কান্নার রেশ ধীর হতে হতে থেমে যাচ্ছে। তখন বাড়ির বয়স্বিনী কোনও মহিলা কাঁসার গ্লাসে এক গ্লাস জল নিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে জলটা খাইয়ে দিলেন। চোখ-মুখ জলের ঝাপটা দিয়ে ধুয়ে দিলেন, তারপর শাড়ির আঁচল দিয়ে তাঁর মুখটা মুছে দিলেন।

মোটামুটি আমাদের গাঁয়ের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই রকম কান্নার চল ছিল। কারণ খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছি। মনে হয়, প্রথম যৌবনের মৃত সন্তানের কথা মনে করে বা কিশোর বা যৌবন বয়সের কোনও ছেলে বা মেয়ের মৃত্যুর অত্যন্ত কষ্টকর স্মৃতি হঠাৎ বুকের মধ্যে উছলে ওঠা– এই রকম কান্নার কারণ। ঠিক এই রকম কান্না বাইরের গ্রাম থেকে আসা বউ-ঝিয়েদের জন্যে স্বাভাবিক ছিল। গ্রামেই যাদের বিয়ে হয়েছে, তাদের কাউকে এ ভাবে কাঁদতে দেখিনি। কান্নার এই রীতিটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল কি না মনে পড়ে না। বোধহয় না। ওদের মধ্যে বিধবাদের এক রকম বাণীবহুল শুকনো কান্না বেশ শুনেছি। অনেকগুলো কথা বলার পরে কান্নার আওয়াজটা শোনা যেত। বউ-ঝিদের কান্না তেমন শুনিনি। একটু সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বন্ধুদের বলতে শুনেছি– ‘জল জঙ্গল আঁধার রাত, এঁড়ে গরু নেড়ে জাত’। কেউ কেউ বলত, কেবল জুতো আর ছাতায় মুসলমানেরা এক হিন্দুদের সঙ্গে। কিন্তু এ সবই নির্বিষ মন্তব্য। আমি যে প্রীতি আর সৌহার্দ্যর কিছু কিছু নমুনা দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, এই সব ছোটখাটো পার্থক্য উভয় সম্প্রদায়ের বাস্তব সম্পর্কের কোনও রকম তফাত ঘটায়নি। খাদ্যাভ্যাস প্রায় একই রকম যেমন ছিল, তেমনই পার্থক্যও ছিল। আমরা যেটাকে বলি ধুকির পিঠে (বাংলাদেশে ভাপা পিঠে বলে), সেটা কখনওই হিন্দু সম্প্রদায় বানাত না বা খেতও না। হিন্দুদের যেটা ‘আসকে পিঠে’, মুসলমানদের সেটা ‘থোঁর’  পিঠে। মনে হয়, পিঠে তৈরিতে মুসলমান সমাজই এগিয়ে ছিল। পাতলা সিল্কের চাদরের মতো এক রকম রুটি বানানো হয়, যার দশটা একসঙ্গে খাওয়া যেত। ‘সেমাই’ তো মুসলমানেরা বাড়িতেই তৈরি করত। এক সময় মেয়েরা বাড়িতে বসে বসে হাতেই তৈরি করত সেমাই। পরে একটা কল বেরলো, যাতে সরু মোটা নানা রকম সেমাই তৈরি করা যেত। অদ্ভুত ব্যাপার, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে এ ধরনের পিঠে হত না। মনে হত যেন নিষিদ্ধ ও-সব। কিন্তু আসলে তা তো হতে পারে না। চালের আটা-ই তো একমাত্র উপকরণ। ওই সময় আমার অনেক হিন্দু বন্ধুকে ‘ধুকি’ ‘সেমাই’– এই সব খাইয়েছি। তারা খেত ঠিকই, কিন্তু তৃপ্তি করে খেত কি না জানি না। আমি আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগেকার জীবনযাপন, রীতি আর অভ্যাসের কথা বলছি। এ বার গাঁয়ে গিয়ে মনে হল, এই তফাতটুকুও মুছে গিয়েছে। বরং রাজনৈতিক মেরুকরণই চোখে পড়েছে বেশি।

এখনও কি কান্নার রীতিটা আগের মতোই আছে? দূর গাঁয়ের আত্মীয়র মৃত্যু হলে অনেক সময় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে সঙ্গে যাওয়া সম্ভব হত না। মহিলাদের বলতে শুনেছি, ‘ছ’মাস হয়ে গেল অমুকের মরা, এখনও কাঁদতে যাওয়া হল না। এটাও শুধুমাত্র রীতি। এর সঙ্গে শোক বা দুঃখের কোনও যোগাযোগ নেই। হয়তো গরুর গাড়িতে এক দল মহিলা যাচ্ছে ছ’মাস আগের সেই বকেয়া কান্না কাঁদতে। টপ্পর  গাড়ির সামনের আর পিছনের দিকটা শাড়ি দিয়ে ঢাকা। কাজেই চার পাশ দেখার কোনও উপায় নেই। হয়তো একটা মোষ বা গরু মূত্র ত্যাগ করছে, গাড়োয়ান গাড়ি থামাল তার কাজটা শেষ করার জন্যে। সঙ্গে সঙ্গে ভিতরের মহিলারা একসঙ্গে শিয়াল ডাকার মতো কাঁদতে শুরু করল। গাড়োয়ান বলছে: ‘ধুত্তেরি, এখনও গাঁয়েই ঢুকিনি! এই গরুটাকে একটু থামতে দিয়েছি পেসাব করার জন্য।’ তখন সবাই চুপ করল। এই রকম হাস্যকর কান্নার রীতি এখনও বজায় আছে কি না জানি না। তবে এখনও তো গরুর গাড়িই নেই, এই কান্নার রীতিও আর বজায় আছে বলে মনে হয় না। মানুষের মানুষতার একটা খুঁটো ঠিকই আছে। তার চার পাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষ। সে কতটা বদলাতে পারে? তবু মনে হয়, আগের মানুষের সঙ্গে এ কালের মানুষের আকাশ-পাতাল তফাত তৈরি হয়ে গেছে। বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়েনি, যুক্তি জ্ঞান বুদ্ধি বাড়েনি, বেড়েছে তথ্য আর খবর। তাতে মনে হয়, মানুষ বদলিয়েছে, বদলাচ্ছে আর বদলাবেই। সবই ঠিক। খুঁটোটাও কি উপড়ে পড়বে?

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

হিকমার প্রতিষ্ঠাতা কাওসারের কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক : নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন শাহাদাত-ই আল-হিকমার প্রতিষ্ঠাতা কাওসার হুসাইন সিদ্দিকীকে (৪০) দুই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *