Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • নাটোরে বৈশাখী মেলার নামে জুয়া খেলা বন্ধ করেছে জেলা প্রশাসন– বিস্তারিত....
  • রাবির আবাসিক হলে এইচএসসির অমুল্যায়িত খাতা!– বিস্তারিত....
  • জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর : এরশাদ– বিস্তারিত....
  • নাটোরে বৈশাখী মেলায় প্রকাশ্যে জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য– বিস্তারিত....
  • প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে নগরীতে প্রকৃতি বন্ধন– বিস্তারিত....

সাদত হাসান মান্টো’র গল্প । তোবা তেক সিং

জুলাই ৬, ২০১৬
সাদত হাসান মান্টো (১৯১২-১৯৫৫) উর্দু ভাষার প্রখ্যাত গল্পকার। ১৯১২ সালে ভারতের লুধিয়ানা জেলার সাম্ব্রলায় তাঁর জন্ম। দেশ বিভাগের পর তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করে পাকিস্তানের লাহোরে বসবাস করতে বাধ্য হন। তাঁর নির্বাচিত ছোটগল্প সংকলন ‘নমরুদ কে খুদা’ এবং ‘গজ্ঞে ফেরেস্তা’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশ বিভাগের পটভূমিকায় সংঘটিত নির্মম বর্বরতার বাস্তবচিত্র তাঁর ছোটগল্প সংকলন সিইয়াহ হাশিইয়া। দেশবিভাগের শিকার তোবা তেক সিং নামের এক হত দরিদ্র এক শিখের পৈত্রিক আবাস পাকিস্তানের অংশের অর্ন্তভুক্ত হওয়ায় সে পাগল হয়ে পাগলাগারদে স্থানান্তরিত হওয়ায় পটভূমিকায় লেখা ‘তোবা তেক সিং’ গল্পের বঙ্গানুবাদ করা হলো প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিংয়ের ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করেছেন মনোজিৎকুমার দাস

উপমহাদেশ ভাগাভাগির বছর দু’ বা তার কিছু পরে পাকিস্তান ও ভারত সরকার অনুধাবন করলো যে তাদের নিজ নিজ দেশের পাগলাগারদে আটক অপরাধী ও অপ্রকৃতিস্থদের বিনিময় করা প্রয়োজন। অর্থাৎ ভারতের পাগলাগারদে আটক মুসলমানদের পাকিস্তানের হাতে এবং পাকিস্তানের পাগলাগারদে আটক হিন্দু ও শিখদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া জরুরি। আমরা জানি না এ সিদ্ধান্তটা যুক্তিসঙ্গত ছিল কিনা।

দু’দেশের উচ্চ পর্যায়ের আমলারা তাদের বিনিময়ের দিন তারিখ নির্ধারণের জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিমিত্ত বহুবার মিলিত হয়েছেন। বিনিময়ের দিন তারিখ এগিয়ে এলে লাহোরের পাগলাগারদে নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হলো। একজন মুসলমান গারদী নিয়মিত ‘জমিদার’ পত্রিকার পাঠক। তাকে তার বন্ধু একদিন জিজ্ঞেস করলো ‘মৌলভী সাব, ওরা পাকিস্তান পাকিস্তান বলছে ওটা কী জিনিস? অনেকক্ষণ চিন্তা করে মৌলভী সাহেব উত্তর করলো, ‘ওটা ভারতের একটা জায়গা যেখানে রেজর ব্লেড তৈরি হয়। একজন অপ্রকৃতিস্থ শিখ অপর একজন শিখকে একদিন জিজ্ঞেস করলো । ‘সর্দারজী, আমাদের কেন ভারতে পাঠানো হচ্ছে? আমরা তাদের ভাষা জানি না। সর্দাজরী হেসে উত্তর করলো আমি হিন্দুস্থানীদের ভাষা জানি।’ একথা বলে সে হিন্দুস্থানী ভাষায় জ্ঞানের বহর প্রকাশের উদ্দেশ একটা বাজে ধরনের ছড়া আউড়ালো।

একদিন সকালের ঘটনা, অপ্রকৃতিস্থ একজন মুসলমান পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিতে শুরু করলো। স্লোগান দেবার এক পর্যায়ে সে মেঝেয় পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। পাগলা গারদের বাসিন্দারা বাস্তবে অপ্রকৃতিস্থ ছিল। যদিও অনেকে খুনখারাপীর সঙ্গে জড়িত থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়স্বজনরা তাদের পাগল সাজিয়ে কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে পাগলা গারদে ঠাঁই পাবার ব্যবস্থা করে দেয়। পাগলা গারদের বাসিন্দাদের মধ্যে অনেকেই দ্ব্যর্থবোধক যুক্তি খাঁড়া করার চেষ্টা করতে ওস্তাদ। কেন ভারত ভাগ হলো? পাকিস্তান কী? তারা প্রকৃত সত্য সম্বন্ধে খুব কমই জানতো।

গারদীরা রক্ষীদের কথাবার্তায় জেনেছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামে একজন  নেতা আছেন যাকে কায়েদে আজম বলা হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ওরফে কায়েদে আজম মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামে পৃথক একটা রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু তারা কেউই জানে না পাকিস্তান কোথায় ও কতদূরে পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সব কারণে পাগলা গারদের বাসিন্দাদের সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্ত বলাই সঙ্গত হবে। তারা জানে না, তারা পাকিস্তানে না ভারতে আছে। যদি পাকিস্তানে থেকে থাকে তবে ভারত কোথায়? আর যদি ভারতে থেকে থাকে তবে পাকিস্তান কোথায়?

একদিন একজন মুসলমান পাগলা গারদী পাকিস্তান ও ভারত সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ পাগলামো শুরু করে দেয়। এক পর্যায়ে পাগলামি আগের চেয়ে বেড়ে যায়। একদিনের ঘটনা, মেঝে ঝাড়– দিতে দিতে পাগলামো বেড়ে গেলে সে ঝাড়– ফেলে দিয়ে একটা গাছে চড়ে বসলো। গাছের ডালে বসে প্রায় দু’ঘন্টা ধরে বক্তৃতা ঝাড়লো। রক্ষীরা তাকে নিচে নামানোর চেষ্টা করলে সে গাছের মগডালে উঠে পড়ে আবোলতাবোল কথা বলে চললো। গাছ থেকে নেমে না আসায় রক্ষীরা তাকে ভয়ভীতি দেখালে সে বললো, ‘আমি পাকিস্তান বা ভারত কোনটাতেই বাস করতে চাই না। আমি গাছের মগডালে বসবাস করবো। কিছু সময় পরে তার পাগলামো কমলে তাকে গাছ থেকে নামানো সম্ভব হলো। নেমেই সে হিন্দু ও শিখদের প্রণাম করে কেঁদে ফেললো। সে চিন্তায় পড়ে গেল যে তার হিন্দু ও শিখ বন্ধুরা তাকে ফেলে ভারতে চলে যাবে কিনা।

রেডিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এম.এসসি ডিগ্রিধারী একজন পাগলা গারদী সব সময়ই নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখতে পছন্দ করতো। সে দিনের অধিকাংশ সময়ই বাগানের নির্জন স্থানে ঘোরাফেরা করে সময় কাটাতে ভালবাসতো। হঠাৎ করে তার মাঝে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। একদিন সে তার সমস্ত কাপড়চোপড় গা থেকে খুলে হেড কনস্টেবলের হাতে দিয়ে দিগম্বর হয়ে চলাচল করতে শুরু করলো।

একজন মোটাসোটা চেহারার মুসলমান পাগলা গারদী মুসলিম লীগের একজন সাবেক সেতা। সে নিয়মিত দিনে পনের থেকে ষোল বার গোসল করে। কিন্তু হঠাৎ করে সে একেবারেই গোসল করা ছেড়ে দিল। লোকটার নাম মোহম্মদ আলী। সে একদিন ঘোষণা দিল যে সে হচ্ছে মোহম্মদ আলী জিন্ন্াহ। তার সেলের শিখ পাগলা গারদটি মুসলমান পাগলাটার দেখাদেখি নিজেকে তারা সিং বলে ঘোষণা করে বসলো। গারদের কর্তৃপক্ষ তাদের বিপজ্জনক বলে সার্কুলার জারি করে তাদের পৃথক পৃথক সেলে স্থানান্তর করলো।

অপ্রকৃতিস্থ লাহোরের একজন আইনজীবীকে পাগলা গারদের বাসিন্দা হতে হয়। শোনা যায়, তার প্রেমিক তাকে প্রত্যাখ্যান করায় সে পাগল হয়ে যায়। যখন সে শুনলো তার প্রণয়িনীর বাসস্থান অমৃতসর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তখন সে মুষড়ে পড়লো। মেয়েটি তার ভালবাসাকে প্রত্যাখ্যান করলেও সে তাকে তখনো ভুলতে পারেনি। সে সব সময় দু’দেশের নেতাদের নাম ধরে ধরে গালিগালাজ করে সময় কাটায়। নেতারাই তাকে পাকিস্তানি এবং তার প্রিয়াকে ভারতীয় বানানোর জন্য দায়ী। তার পাগলামি বেড়ে গেলে অন্যান্য কয়েদিরা তাকে এটা বলে সান্ত¦না দেয় যে তাকে তাড়াতাড়িই ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে যাতে সে তার প্রেমিকার সাথে মিলিত হতে পারে।  সান্ত¦না বাক্যে সে মোটেই আশ্বস্ত হতে পারে না। কারণ তার সন্দেহ যে সে অমৃতসরে যেয়ে আইন ব্যবসায় সফল হতে পারবে।

অন্য দিকে পাগলাগারদের ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডে একটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান দম্পতি বসবাস করে আসছিল। ইংরেজরা ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিয়ে স্বদেশে ফিরে গেছে জেনে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে তাদের আগের মতো যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে তারা বিশেষভাবে সন্ধিহান হয়ে উঠলো। ইউরোপিয়ানদের জন্য কি আলাদা ওয়ার্ড থাকবে? তাদের কি আগের মতো ব্রেকফাস্ট দেয়া হবে, তাদের কি টোস্টটের পরিবর্তে রুটি দেয়া হবে?

পাকিস্তানের এই পাগলা গারদে পনের বছর যাবৎ একজন অপ্রকৃতিস্থ শিখ গারদী হিসাবে আছে। তার কাছ থেকে এ কথাগুলো ছাড়া অন্য কথা খুব কমই অন্যেরা শুনেছে। ‘ও পারদি, গুদ গুদ দি, আনেকাস দি বেধ্যানা দি মংদি দাল আপ দি পাকিস্তান গভার্নমেন্ট। সে প্রায়ই তার সঙ্গীদের কাছে জিজ্ঞেস করে থাকে, ‘তোবা তেক সিং এর গ্রাম ভারত না পাকিস্তানে? ‘কেউ তার প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারে না। তবে তারা এই বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চালায় যে শিখরা প্রথমে ভারত ভুক্ত হয়ে পরে পাকিস্তানের অধীনস্থ হয়। ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের ভাগ্যে কী ঘটবে তা তারা জানে না। এ শিখ পাগলটার মাথার অধিকাংশ চুলই উঠে গেছে। যে  কয়গাছা অবশিষ্ট তা গোছলের সময় দাড়ির সঙ্গে গিরো দিয়ে বেঁধে রাখে। সে সময় পাগলটাকে উদ্ভুত দেখায়। যদিও সে স্বভাব চরিত্রে শান্ত ও নিরীহ। গত পনের বছরের মধ্যে কারো সঙ্গে ঝগড়া মারামারি কিংবা কথা কাটাকাটিও করতে দেখা যায়নি। পাগলা গারদের সকল বাসিন্দারাই জানে তোবা তেক সিং গ্রামে তার জমাজমি আছে। সে এক সময় গ্রামের মধ্যে একজন বড় চাষি ছিল। সে যখন মানসিক ভাবে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে তখন তার আত্নীয়স্বজনরা তাকে পাগলা গারদে ভর্তি করে দেয়। মাসে একবার করে তার আত্নীয়স্বজনরা তাকে দেখতে লাহোরের গারদে আসতো। পাকিস্তান ও ভারত রাষ্টের সৃষ্টি হলে তাদের আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পাগল শিখটা নাম বিশেন সিং হলেও গারদের সবাই তাকে তোবা তেক সিং বলে ডাকে। বিশেন সিংয়ের দিন, সপ্তাহ মাস এমন কী সময় সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। এ পাগলা গারদে সে কত বছর বসবাস করছে তা সে বলতে পারে না। তবে তার আত্মীয়স্বজনরা যখন তাকে একবার দেখতে আসতো তখন সে বুঝতে পারতো যে এর মাঝে এক মাস পার হয়ে গেল। সে গারদের ওয়ার্ডারকে জানাতো যে মিস ইন্টারভিউ তাকে দেখতে আসছে। তখন সে অতিযত্ন সহকারে নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতো। সে গায়ে সাবান ও চুলদাড়িতে তেল দিয়ে পরিপটি করতো। তার আত্মীয়স্বজন তার সাথে দেখা করতে এলে সে সুন্দর পোশাক পড়তো। যদি তারা কোন প্রশ্ন করতো তবে সে নীরব থাকতো অথবা উত্তরে বলতো, ‘ও পারদি, গুদ গুদ দি…।’                                                                                                          বিশেন সিংয়ের সুন্দরী মেয়েটির বয়স বছর পনের। নিজের মেয়ের প্রতি কিন্তু একটুও মমত্ববোধ ছিল না। যখন মেয়েটি পাগলা গারদে তার বাবাকে দেখতে আসতো তখন তার বাবা তার কন্যাকে দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো। ভারত ও পাকিস্তান নিয়ে কথা উঠলে বিশেন সিং অন্যান্য কয়েদিদের জিজ্ঞাসা করতো, ‘তোবা তেক সিং গ্রাম কোথায়?’ কেউই তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারতো না। ফলে প্রশ্নটার জবাব পাবার জন্য তার আগ্রহ বাড়তেই তাকে। সে ভাবে, মিস ইন্টারভিউ আমাকে দেখতে কেন আসে না। কেন তার আত্মীয়স্বজনরা তাকে কেন দেখতে আসে না তা জিজ্ঞেস করলে সে নীরব থাকে। মাঝেমধ্যে সে তার আত্মীয় স্বজনদের দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। ‘তোবা তেক সিং গ্রাম’ গ্রামটা পাকিস্তানে না ভারতে তা জানানোর জন্য বিশেষ ভাবে উৎকন্ঠিত হয়ে পড়ে।

অধিকাংশ পাগলই তাদের বিনিময়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলো। কেন তাদের সেখান থেকে অন্যত্র পাঠানো হবে। পাগলদের মধ্য থেকে কেউ কেউ পাকিস্তান জিন্দাবাদ আবার কেউ কেউ পাকিস্তান মুর্দাবাদ ধ্বনি দিতে লাগলো। অবশেষে বিশেন সিং জিজ্ঞেস করলো, ‘তোবা তেক সিং গ্রাম কোথায়? ভারতে না পাকিস্তানে?’

এদিকে পাগলা গারদের একজন পাগল নিজেকে ভগবান বলে ভাবে। বিশেন সিং একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলো যে তোবা তেক সিং গ্রাম পাকিস্তানে না ভারতের মধ্যে। তথাকথিত ভগবান অঙ্গভঙ্গি করে ক্ষণিকের জন্য নীরব থেকে বললো, ‘এ বিষয়ে এখনো আমরা কোন নির্দেশ জারি করি নি।’ বিশেন সিং তার কাছে একই প্রশ্ন বারবার করে একই জবাব পেয়েছে। ফলে সে বারবারই নিরাশ হয়েছে। তথাকথিক ভগবানের বহু জরুরি বিষয় আছে। আদেশ পাবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিশেন সিং ধৈর্য হারিয়ে একদিন সেই ভগবানকে বললো যে সে যদি শিখদের ভগবান হতো তবে সে তার আর্জি মঞ্জুর করতো।

পাগলদের বিনিময়ের দিন ঠিক করার কয়েকদিন আগে তোবা তেক সিং গ্রাম থেকে একজন মুসলমান বিশেন সিংকে দেখতে এলো। লোকটি আগে কখনো পাগলা গারদে আসেনি। বিশেন সিং তাকে দেখে সেখান থেকে চলে যাবার উপক্রম করলে রক্ষীরা তাকে থামিয়ে বললো, ‘তোমাকে দেখতে এসেছে, এ হচ্ছে তোমার বন্ধু ফজল দীন। বিশেন সিং ফজল দীনের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বিড়বিড় করতে লাগলো। ফজল দীন তার হাত বিশেন সিং এর ঘাড়ে রেখে বললো, ‘ অনেক দিন থেকে তোমাকে দেখার ইচ্ছে। কিন্তু সময়ের অভাবে তা এতদিন সম্ভব  হয়ে উঠেনি। তোমার পরিবারের সবাই নিরাপদে ভারতে পাড়ি দিয়েছে। আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব তাদের জন্য করেছি। তোমার মেয়ে রূপকাউর– ফজল দীন কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়। ‘হ্যাঁ, সে ভাল আছে। সে পূর্ণ বিশ্রামেই আছে।’ বিশেন সিং একটা কথাও না বলে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। ফজল দীন আবার বলতে শুরু করলো, ‘আমি তোমার পরিবারবর্গকে বলেছি যে ওরা তোমাকে ভারতে পাঠিয়ে দেবে। তোমার বলবীর ভাইকে আমার সালাম দিও। ভাই ওয়ার্ধা সিং ও বোন অমৃতা কাপুরকেও সালাম দিও। বলবীর সিংকে বলো ফজল দীন সুখে শান্তিতেই আছে। তারা যে মোষগুলো রেখে গেছে তাদের বাচ্চা হয়েছে। একটা মর্দা আর একটা মাদী বাচ্চা। মাদী বাচ্চাটা ছয় মাস পরে মারা গেছে। আমি তাদের যত্নআত্তি করবো। আমি তোমার জন্য কিছু মিষ্টি এনেছি।’ বিশেন সিং তার হাত থেকে মিষ্টির থলেটা নিয়ে ওয়ার্ডারকে দিয়ে সে ফজল সিংকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোবা তেক সিং গ্রাম কোথায়? পাকিস্তানে না ভারতে?’

‘ না ভারতে নয়। ওটা পাকিস্তানে।’ প্রত্যুত্তোরে ফজল বললো, ‘না ভারতে নয়। ওটা পাকিস্তানে।’ ফজল দীনের উত্তর শুনে বিশেন সিং বিড়বিড় করতে লাগলো এ বলে  ‘ও পারদি, গুদ গুদ দি, আনেকাস দি বেধ্যানা দি মংদি দাল আপ দি পাকিস্তান গভার্নমেন্ট।’ অপ্রকৃতিস্থদের বিনিময়ের জন্য সমস্ত রকমের প্রাথমিক আয়োজন সমাপ্তির পথে। দু’পাড়ের আটক পাগলদের নামের তালিকা তৈরি করে তাদের আত্মীয়স্বজনদের জানানোর পর তাদের বিনিময়ের তারিখ নির্ধারিত হলো।

তীব্র শীতের সকাল। পুলিশের কঠোর নিরাপত্তামূলক প্রহরায় শিখ ও হিন্দু পাগল ভর্তি বাস লাহোরের পাগলা গারদ ত্যাগ করলো। ওয়ার্ধা সীমান্তে উভয় দেশের তত্ত্বাবোধকরা সুচারুরূপে বিনিময়ের কাজ সমাধা করার জন্য মিলিত হয়েছেন। বাস থেকে পাগলা গারদীদের বের করে অপর দেশের অফিসারদের কাছে প্রত্যর্পণ করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে উঠলো। বেশ কয়েকজন বাস থেকে নামতে অস্বীকার করে বসলো। আর যারা ইতোমধ্যেই বাস থেকে বের হয়ে এসেছে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্টকর হয়ে উঠলো। উলঙ্গ অবস্থায় থাকা পাগলদের পোশাক পরানোর চেষ্টা করা হলো। পোশাক পরানো মাত্র তারা নিজের নিজের পোশাক ছিড়ে ফেললো। কেউ কেউ আবার অশ্রাব্য ভাষায় বকাবকি শুরু করলো। কেউ কেউ উচ্চস্বরে গান ধরলো। আবার কেউ কেউ একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দিল। কেউ কেউ অট্টহাসি দিতে আরম্ভ করলো। হইচই কোলাহল এমন পর্যায়ে পৌঁছালে যা ভাষায় বর্ণনার অযোগ্য।

অধিকাংশ পাগলই তাদের বিনিময়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলো। কেন তাদের সেখান থেকে অন্যত্র পাঠানো হবে। পাগলদের মধ্য থেকে কেউ কেউ পাকিস্তান জিন্দাবাদ আবার কেউ কেউ পাকিস্তান মুর্দাবাদ ধ্বনি দিতে লাগলো। অবশেষে বিশেন সিং জিজ্ঞেস করলো, ‘তোবা তেক সিং গ্রাম কোথায়? ভারতে না পাকিস্তানে?’

ভারতীয় অফিসাররা তাকে নানা ভাবে বুঝাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু সে কোন কথাই শুনতে ও বুঝতে রাজি নয়। যেহেতু তোবা তেক সিং গ্রাম পাকিস্তানে সেহেতু সে শিখ হওয়া সত্ত্বেও সে তার জন্মভূমি পাকিস্তানেই ফিরে যাবে। এরপর তারা বিশেন সিংয়ের উপর শক্তি প্রয়োগ করা চেষ্টা করলো।

বিশেন সিং দু’দেশের বাউন্ডারী লাইনে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়ে পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগলো। তারা তাকে ভারতে নিয়ে যাবার আশা ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য পাগলদের হস্তান্তরের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো।

তোবা তেক সিং গ্রামের বিশেন সিংয়ের দেহ দু’দেশের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে নো ম্যানস ল্যান্ডের ওপর পড়ে রইলো। মুখটা পাকিস্তানের দিকে আর পিছনের দিকে।

অলংকরণ : রাজিব রায়