Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • নাটোরে বৈশাখী মেলার নামে জুয়া খেলা বন্ধ করেছে জেলা প্রশাসন– বিস্তারিত....
  • রাবির আবাসিক হলে এইচএসসির অমুল্যায়িত খাতা!– বিস্তারিত....
  • জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর : এরশাদ– বিস্তারিত....
  • নাটোরে বৈশাখী মেলায় প্রকাশ্যে জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য– বিস্তারিত....
  • প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে নগরীতে প্রকৃতি বন্ধন– বিস্তারিত....

লন্ডন : বসন্তের শীতল কবিতা । আজাদুর রহমান

জুলাই ৫, ২০১৬

ছবির নদী আর বাস্তবের নদী এক নয়! শহরে ঢোকার মুখে টেমসকে খণ্ড খণ্ড করা হয়েছে, তারপর জালের মত করে জনপদের বিবিধ অলিগলিতে পাঠিয়ে দিয়েছে সরকার। তারপর যা হয়! বারোয়ারি অলিগলি ঘুরে ফালতু ময়লা আর ঘোলাজল মুখে করে ছোট ছোট খালাকৃতির নালাগুলো ক্ষণে ক্ষণে ফের মূল টেমসে মিশে গিয়ে কোন মতে প্রাণ হাতে পেয়েছে। ফলে মূলনদী ঠিক মরেনি কিন্তু জাত-কুল হারিয়ে খাপছাড়া হয়ে গেছে। নদীর মত গাছ গাছালিরও এক অবস্থা। ঢাকা শহরে যেমন আম কাঁঠাল ইউকেলিপ্টাস কিংবা নিমের মত হাজারো ভ্যারাইটজ গাছ আছে, এখানে তেমন নয়। লন্ডনজুড়ে কেবল এক জাতের গাছ। যেখানে যাবেন-গাছ একটাই। ফল-ফুলহীন এক বৃক্ষ ছড়িয়ে রয়েছে শহরময়। তবুও কিছুটা মানা যেত কিন্তু গাছগুলোকে কর্তৃপক্ষ মর্জিমত বাড়তে দেয় না। হরবছর আগ বর্ষায় মিউনিসিপিলিটরি লোকজন আচ্ছা মতন মেশিন চালায় ওদের উপর। কেবল মূল কাণ্ডটা বজায় রেখে দস্তুর মত ডালপালা কেটে দেয় ওরা। শ্যামলা গাছগুলো হঠাৎ করেই তখন ঝাঁটার মত ন্যাংটো আর খটখটে হয়ে যায়। মাসখানেক পরে পুরো বর্ষায় ভোতা কাণ্ড থেকে থোকা থোকা কচি পাতা বেরোয়। কেশবতী কন্যার চুল কামিয়ে দিলে যেমন বপ ছাটের মত চুল বেরোয় অনেকটা তেমন হয়ে থাকে। পার্কপাড়া, লম্বা কবরস্থান, বাগান, মাঠ– বলতে গেলে সবকিছুর মধ্যেই আসলে একটা অফিসিয়াল নিয়ম ঢুকে গেছে বোধহয়।

জঙ্গলের গলিতে হঠাৎ করেই শহুরে প্যাটার্ন দিয়ে বানানো ঘের। কাছে গেলাম। ছোট্ট গেট। একজনের বেশি একবারে ঢোকা যাবে না। গলাতেই চোখের পর্দা ঝুলে গেল।

তেতো মন নিয়ে কদমছাট গাছের দিকে তাকিয়ে থাকি। শীতল বসন্ত হয়ত এসেছে। হয়ত বলছি এজন্য যে এখানে বাংলাদেশের মত কোকিল নেই যে আপনি না জানতে চাইলেও কুহু কুহু করে জানিয়ে দেবে যে, আজ বসন্ত। তাছাড়া আমাদের মত করে এখানে মহা উল্লাস-আয়োজনে ১লা ফাগুন হয় না। অফ টাইমে ঘুরতে ঘুরতে কী মনে করে ক’দিন আগে একটা ছিচকে পার্কে ঢুকে পড়েছিলাম। সাদার্ক পার্ক। মনটাই বদলে গেল। নো শব্দ। নিরিবিলির ভিতর প্রকৃতি নিগুঢ় করে বাসা বেঁধে বসে আছে! প্রথমে তেমল আমল দেয়নি। কিন্তু হাত পঞ্চাশেক এগুনোর পর সামনিসামনি দুই পাথুরে যুবতীর দেখা মিলল। জংলাঢিবির খাঁজকাটা গলিতে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে ওদের। সাদা মার্বেলে বানানো কবেকার ভাস্কর্য! জলের আর কালের ধারা গলতে গলতে সুন্দরীদের লাবণ্য খাণিক নেমে গেলেও দেহসৌঠবে আবেদন কমেনি। একজনের উদ্বাহুদ্বয় ভেঙে গেছে। আমি একমনে ওদের চিবুক ধরে পিছল বুক বেয়ে নেমে আসা সময়ের শ্যামলা দেখি। তারপর বোধহয় নিরিবিলি বেড়ে গিয়েছিল। আনমনেই গভীরের দিকে পা বাড়াই। গরজ করে দেখতে হচ্ছে না। খিলানতোলা গাছেরাই পথ পেতে দিচ্ছে। জঙ্গলের গলিতে হঠাৎ করেই শহুরে প্যাটার্ন দিয়ে বানানো ঘের। কাছে গেলাম। ছোট্ট গেট। একজনের বেশি একবারে ঢোকা যাবে না। গলাতেই চোখের পর্দা ঝুলে গেল। জলময় কেলি বেড়াচ্ছে নিতম্ব নির্ভর হংসীরা। কী মোলায়েম জলজ পরিবেশ! সবকিছুই কায়দা করে বানানো। গাছগাছালি মর্জিমত মাথা তুলেছে। জল ছুঁতে গিয়ে আবার হাঁপিয়ে উঠেছে কিছু গাছ। ওদের ছায়াতলেই একদল নিতম্ব নির্ভর হংসীদল দৌড়–তে থাকে। পিছনে তাড়া করে ছুটে চলে হংসরাজ। জলের উপর ঝুলন্ত গাছের ডালে ডালে গোটা কয়েক বেসামাল কাক ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে নামছে। কাক এল কোত্থেকে! এতকাল জানতাম, কাক কেবল বাংলাদেশেই থাকে। আর ঢাকা হল কাকেদের রাজধানী। আমার ভাবনা কেটে কালো কাকগুলো চেনা স্বরে কা কা করে ওঠে। মুহূর্তে হতভাগাদের বড় আপন মনে আমার। আমার মার্জিত চোখে মায়া জমে– কালো কাক! কতদিন তোদের দেখিনা, ভাল আছিস তোরা।

…হংসীদের রঙ্গ থেকে নজর আপনিতেই লাগাতার লম্বা হয়ে যায়। খালটাকে কেটেকুটে সাপের মত এঁকেবেঁকে কেউটে করা হয়েছে। খালের বুক-পাঁজর-কোমর ধরে বুঝে বুঝে হরেক আর বাহারি ঝোপমতন ঝকমারি গাছ এবড়োথেবড়ো হয়ে আছে। কবেকার কাজ এসব, জানি না! তবে এত বছরে আখড়াটা পুরোপুরি জংলি হয়ে গেছে। ঝরনা থেকে শুরু করে সাজগোছ করতে আরও যা যা লাগে-সব মানানসই পজিশনে সেট করা হয়েছে। বেয়ারা প্রকৃতি সুযোগ পেলেই বোধহয় পা মেলে আহ্লাদি হয়ে ওঠে। জলে-জঙ্গলে ভালই জমিয়ে তুলেছে পাখপাখালিরা। জলের প্যাঁচে পড়ে মাঝখানে খামোখাই একটা দ্বীপমতন হয়ে গেছে। পাখি আর প্রজাপতিদের মচ্ছব বোধহয় ওই-গাছালি দ্বীপ। বুঝি না, কেবল জলের ওপাড়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে পাতা ঝরে, বাতাসে শব্দ দোলে-কিচিরমিচির। তারপর পাঁচটা কবুতর প্লেনের গতিতে হাওয়া কেটে নেমে পড়ে। ঘিরে ধরে বাকবাকুম বাকবাকুম শুরু করে দিলে জ্বালাতন করি না বরং গলি ধরে একপাশে সরে যাই। দূরে যেতে পারি না, তার আগেই থরে থরে লাগানো ফুলবনের মধ্যিখানে পাতানো লোহার চেয়ারে বসে পড়ি। কী জানি কেন! অপূর্ব সুন্দরের ভিতরেও নিরামিষ লাগে। এত রূপবান পার্ক! দেখার লোক কোথায়! খুঁজে খুঁজে এক যুগলকে পেলাম, লেকের বিপরীতে রেলিং-এ হেলান দিয়েছে ওরা। নিগূঢ়তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আর যাই হোক এ মানব-মানবীদ্বয়ের মনোযোগ আমার দিকে নামবে না। অগত্যা নিরিবিলি মাথায় করে আরও খানিক গুম হয়ে বসে থাকি। কতক্ষণ! অনেক উপর দিয়ে একটা চিল উড়ে যায়। মাথা তুলি, চারদিক ভাল করে তদন্ত করতে চাই, দেখি রেলিংয়ের জঞ্জাল। খাঁজাকাটা আর নকশিকাটা সবকিছু। তার মানে আপাত আলগা মনে হলেও প্রত্যেক সুন্দরের পায়েই পরানো আছে শাসনের শেকল। দেখা যাবে, ছোঁয়া যাবে না, ভোগ নয়, পারলে নিয়ম মেনে উপভোগ করতে পার। সবাই তো আর আমাদের মত প্রকৃতি খেকো নয়!  হালকা ভাঙা মনে উঠে পড়ি। ঠিক তখনই দু’টো ধবধবে রাজহাঁস জল ভেঙে দৌড়–তে শুরু করে। পায়ে ভর করে ওরা অবশ্য বেশিদূর যেতে পারে না। জলের গভীরতা বাড়ে। মধ্যিখানে কাঁটা কলাগাছের মত ভেসে ভেসে ওরা পানিতে গলা ডোবায়। আনমনেই রেলিং ধরতে নিচের দিকে নামতে থাকি। একটা জলের তল থেকে একটা  রঙিন মাছ লাফিয়ে ওঠে। তারপর ঝিলিক দিয়ে মিলিয়ে যায়। এবার কিনার চেপে হাঁটতে থাকি। পাশেই একটা গোলাকার ঝোঁপ উঁবু হয়ে ঝুলে থাকে। এক পশলা বৃষ্টিতে ঝুপড়িতলায় বসলে মন্দ হত না!  দৃশ্যানন্দেই উপরের দিকে উঠতে থাকি। লতানো ফুলের বাহার দিয়ে ঝাঁপ তোলা বেশ ক‘টা ফুলসুরঙ্গ পেয়ে যাই। ঝাঁপ থেকে শত শত ফুলঝুরি ঝুলে নেমেছে বটঝুড়ির ঢঙে। তলে যাবার পর আউলা লাগে। গুঁড়ি গুঁড়ি নীল ফুল! ঝরে পড়ে তলার পথটাকে চাঁদরের মত ঢেকে দিয়েছে। যেমন সুঘ্রাণ তেমন ফল্গুময়। সৌন্দর্যের সব ছলাকলা যেন কেলিয়ে ধরেছে এখানে। অন্য এক মুগ্ধতা নিয়ে নস্টালজিক হয়ে যাই। মনে পড়ে-আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কী গেছে…। নৃত্যানন্দে মুহূর্ত যায়! খামোখাই সুন্দর ছাপিয়ে একটা ঝামেলার সুঁতো পাকাতে থাকে মাথায়। লন্ডনের সবকিছুর মত পার্কও বাদ যায় নি। সিসি ক্যামারের নজরদারি থেকে। টিকটিকির মত লালচোখে ক্ষণে ক্ষণে তাকিয়ে আছে ক্যামেরা। দুধের মজা ঘোলে মেটানো ছাড়া কী আর করার আছে! এত আর রমনা কিংবা সোহরাওয়ার্দি নয় যে, মন চাইল তো ঘাসের উপর মাথা দিয়ে একবেলা ঘুমিয়ে নিলাম। বাদাম চা সিগারেট খেয়ে বুঝিয়ে দেব নিজের অস্তিত্ব! এখানে পার্ক আছে। ফুটফুটে বাগান আছে কিন্তু হাফ ছেড়ে ঝাড়া হাত পায়ে বাপদাদার জমিনের মত নিজের বলে বসার জো পাওয়া যায় না। সোহরাওয়ার্দি কিংবা রমনার মত উদার জমিন আর কোথায় আছে, বাংলা ছাড়া! আফসোসমুখে লম্বালম্বি হাঁটতে থাকি। পার্ক ছেড়ে কোন ফাঁকে আবার পাথুরে শহর এসে পড়ে। মনে পড়ে বাংলাদেশ– নীলাকাশ যেখানে চিরকাল ছুঁয়ে থাকে নীরাময়ী দিগন্ত।