Ad Space

তাৎক্ষণিক

ঈদসংখ্যা : লেখকের প্রতারণা-বাণিজ্য । অনুপম হাসান

জুলাই ৫, ২০১৬

সাহিত্য পণ্য কিনা প্রশ্ন তোলা হলে অনেকেরই আত্মসম্মানে আঘাত লাগবে, বলবেন এ আবার কেমন কথা? নিশ্চয় সাহিত্য পণ্য নয়। একথা আপনাদের মতো আমিও স্বীকার করি, বিশ্বাস করি সাহিত্য পণ্য নয়। কেননা পণ্যের বাজারমূল্য আছে, সাহিত্যের কী তাই হয়? নাকি বাজারমূল্য দিয়ে সাহিত্যের বিচার হতে পারে? এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে ভেতরের যুক্তিবোধ গুলিয়ে যায়, আমরা ব্যাপারটি ঠিক গুছিয়ে বলতে পারি না। কেননা একালে কর্পোরেট পুঁজি তো রীতিমতো সাহিত্যকে পণ্যের মানে নিয়ে গিয়ে মুনাফা অর্জন করছে। এটা কী পুঁজির দোষ? আমি অন্তত স্বীকার করি না। কারণ, পুঁজির ধর্মই তো মুনাফা অর্জন করা। কিন্তু বিবেকে বাধছে অন্যত্র; পুঁজির এই কর্পোরেট চরিত্রের কথা জেনেও আমাদের শ্রদ্ধেয় লেখকবৃন্দের অবস্থান কী? তাঁরা তো রীতিমতো পৃষ্ঠপোষকতা করছেন কর্পোরেট পুঁজিকে! বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কিভাবে কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা অর্জনে লেখকগণ সহায়তা করছেন?

লেখক জীবদ্দশায় তাঁর রচনার পরিবর্তন করবেন; এটা তাঁর নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার বা অধিকারের বিষয়। এই ব্যক্তিগত অধিকারের ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের কথা নেই। তবে পাঠক যখন অর্থের বিনিময়ে একটি গল্প বা উপন্যাস ক্রয় করেন, সেই একই পণ্যের বা গল্প-উপন্যাসের জন্য লেখক কোন নৈতিক অধিকারে পুনরায় মূল্য চাইবেন? একই বস্তু কী শুধু নাম পরিবর্তন করে দ্বিতীয়বার বিক্রি করার অধিকার আছে লেখকের? অথবা একটি প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু কী সেই পরিমাণ পরিবর্তন করা উচিত, যাতে লেখাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে ওঠে?

চিরকালই একথা সত্য যে, অনেক লেখকের মধ্যে গুটিকয় লেখকের ভাগ্যে সামাজিক, কখনো কখনো আর্থিক প্রতিষ্ঠা জোটে। কিন্তু একালের বিকশিত

কর্পোরেট পুঁজি মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পূর্বাহ্ণেই একজন (একাধিকও হতে পারে) লেখক নির্বাচন করে তাঁর কপালে সৌভাগ্যের তিলক পরিয়ে দেয়; তখন লেখকের পদানত হয় অর্থলক্ষ্মী। তাঁর গাড়ি-বাড়ি হয়, আর্থিক জৌলুস চমকায় চারপাশে। কর্পোরেট পুঁজি তার নির্বাচিত লেখক সম্বন্ধে প্রচার-প্রপাগাণ্ডার মাধ্যমে প্রমাণ করে, তিনি দেশের বড় লেখক কিংবা সবচেয়ে প্রতিভাবান লেখক। প্রচারেই প্রসার– পুঁজির এই প্রায়োগিক সূত্রমতে একদিন আমরাও বিশ্বাস করি। জনগণের বিশ্বাস দৃঢ় হলে শুরু হয় পুঁজির মুনাফা অর্জনের দৌড়। তখন, কর্পোরেট পুঁজি তার নির্ধারিত লেখকের রচনাকে, তাঁর বক্তব্যকে এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর বাহ্যাবয়বকেও বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করে। কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা অর্জনের এই চক্র অত্যন্ত জটিল-দুরূহ এবং বিশদ আলোচনা সাপেক্ষ ব্যাপার; আমরা এখানে শুধুমাত্র কর্পোরেট পুঁজির ঈদসংখ্যা বিষয়ক বাণিজ্য নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনার প্রয়াস পাবো।

ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে কর্পোরেট পুঁজির বিনিয়োগকৃত দৈনিক পত্রিকাগুলো ঈদসংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে একটা বড় মুনাফা অর্জন করে থাকে। ঈদকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এসব দৈনিকের বিশেষ সংখ্যা তথা কর্পোরেট ঈদসংখ্যা প্রকাশের বেশকিছুদিন আগে তাদের নির্বাচিত নামি-দামি লেখকদের পণ্য উৎপাদনের বায়না দেয় এবং পাশাপাশি বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে এবার আমাদের ঈদসংখ্যায় থাকছে অমুকের উপন্যাসে, তমুকের গল্প ইত্যাদি। পুঁজি বিজ্ঞাপন প্রচার করে মূলত তার ব্যবসায়িক স্বার্থে অথবা অধিকতর মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে। অন্যদিকে লেখার বা পণ্য উৎপাদনের বায়না পেয়ে বগল বাজাতে শুরু করেন নামি-দামি লেখকগণ। এবারে তাঁরা (যারা ঈদসংখ্যায় লেখার বায়না পেলেন) বুক ফুলিয়ে গল্প দেন– এবার কয়টি ঈদসংখ্যায় তাঁর গল্প-উপন্যাস প্রকাশ হচ্ছে। তিনি ভাবছেন না, কয়টি তিনি মানসম্পন্ন গল্প বা উপন্যাস লিখতে পারবেন। তিনি ভাবছেন, কয়টি কর্পোরেট পুঁজির ঈদসংখ্যায় তিনি লেখা দিলেন! অর্থাৎ লেখক পণ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় নেমে গেলেন; বলার অপেক্ষা রাখে না, এক্ষেত্রে পুঁজিই নির্ধারণ করে দেয় কোন্ লেখকের বাজারমূল্য কত? কেননা, কর্পোরেট ঈদসংখ্যার মালিক বা সম্পাদকগণ বিভিন্ন শ্রেণীর লেখকের নিকট থেকে বিভিন্ন মূল্যে তাদের উৎপাদিত পণ্য (গল্প-উপন্যাস) ক্রয় করে। পুঁজির ধর্মই মুনাফা অর্জন; এজন্য সে নিজেকে বাজারে সর্বাধিক আকর্ষণীয় পন্থায় উপস্থাপন বা প্রচার করে। কিন্তু আমাদের শ্রদ্ধেয় দেশসেরা লিখিয়েগণ কী চান! লেখকের উদ্দেশ্যও কী মুনাফা; অথবা নিছক অর্থোপার্জন করা!

লেখকের কর্পোরেট বাণিজ্যলগ্নির বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে আলোচনা করা দরকার। আমাদের শ্রদ্ধেয় লেখকগণ যখন কর্পোরেট ঈদসংখ্যায় তাঁদের উৎপাদিত পণ্য দেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করেন; প্রায় অসম্ভব রকমের বায়না গ্রহণ করেন; তখন কী তাঁর পক্ষে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়? অথবা তিনি যে মানের লেখক, সেই মানের লেখা সরবরাহ করতে সক্ষম হন? বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় লিখতে গিয়ে লেখক সাদামাটা কথায় তাঁর পাঠকদের সাথে প্রতারণা করেন। আমার বক্তব্য শুনতে বিস্ময়কর মনে হলেও একটু তলিয়ে দেখলে বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। কেননা কর্পোরেট পুঁজির লগ্নিকৃত ঈদসংখ্যায় যেসব গল্প-উপন্যাস লেখকগণ পরিণামে সরবরাহ করেন, তার কোনোটাই আসল না। কথাটি খোলাসা করা দরকার; নামি-দামি লেখকের গল্প-উপন্যাস পড়ার আশায় পাঠক যখন একটি কর্পোরেট ঈদসংখ্যাটি বাজার থেকে কেনে, তখন সে প্রতারিত হয় পুঁজির নিকট নয়, লেখকের দ্বারা। কারণ, লেখক অনেকগুলো কর্পোরেট ঈদসংখ্যার বায়না বা বাজার ধরতে গিয়ে তাঁর পণ্যটি (গল্প-উপন্যাস) তাড়াহুড়ো করে হস্তান্তর করেন। যে লেখাটি তিনি পরে নিজেই সঠিক মনে করেন না। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরে দেখা যায়, লেখক তাঁর গল্প কিংবা উপন্যাসটি বইমেলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় পুনর্লিখনের মাধ্যমে ঈদসংখ্যার লেখাটির খোলনালচে পাল্টে ফেলেন। কেউ কেউ আবার নামটি পর্যন্ত বদলে দিতেও কুণ্ঠা করেন না। লেখকের এই কার্যক্রমের প্রেক্ষিতে কর্পোরেট ঈদসংখ্যার ক্রেতাগণ যে প্রতারিত হলোÑ সেকথা কী লেখক বুঝতে পারলেন! কারণ, বইমেলা থেকে যখন কর্পোরেট ঈদসংখ্যার ক্রেতা নামি-দামি লেখকের গল্প-উপন্যাসের নতুন নাম দেখে ক্রয় করেন, তখন তিনি বুঝতে পারেনÑ এই লেখাটিই তিনি ক্রয়কৃত ঈদসংখ্যায় পড়েছিলেন ভিন্ন নামে। যেসব গল্প-উপন্যাসের নাম ঠিক করে ভেতরের বিষয় পুনর্লিখন করেন লেখক, সেক্ষেত্রেও ঈদসংখ্যার ক্রেতা প্রতারিত হয়। কারণ, সে মনে করে এ গল্প বা উপন্যাসটি তো তিনি ঈদসংখ্যায়ই পড়েছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, খোলনালচে পাল্টে ফেলা ভিন্নতর লেখাটি পড়া থেকে বঞ্চিত হন পাঠক।

আমার প্রশ্ন এখানেই যে, লেখক জীবদ্দশায় তাঁর রচনার পরিবর্তন করবেন; এটা তাঁর নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার বা অধিকারের বিষয়। এই ব্যক্তিগত অধিকারের ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের কথা নেই। তবে পাঠক যখন অর্থের বিনিময়ে একটি গল্প বা উপন্যাস ক্রয় করেন, সেই একই পণ্যের বা গল্প-উপন্যাসের জন্য লেখক কোন নৈতিক অধিকারে পুনরায় মূল্য চাইবেন? একই বস্তু কী শুধু নাম পরিবর্তন করে দ্বিতীয়বার বিক্রি করার অধিকার আছে লেখকের? অথবা একটি প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু কী সেই পরিমাণ পরিবর্তন করা উচিত, যাতে লেখাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে ওঠে? এসব প্রশ্ন উঠছে এজন্য যে, লেখক কর্পোরেট ঈদসংখ্যায় তাঁর হাফ-ডান বা অর্ধ-সমাপ্ত লেখাটি তো আর্থিক মূল্যেই বিকিয়েছিলেন! কারণ, তাঁর সেই পণ্যটিকে পুঁজি করে ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে তো অনেকগুণ মুনাফা অর্জন করেছে কর্পোরেট পুঁজির মালিক বা সম্পাদক।

এবারে কর্পোরেট পুঁজির লগ্নিকৃত ঈদসংখ্যায় কোন শ্রেণীর লেখা প্রতারণামূলক হয়– সেটা বিবেচনা করা যাক। আমরা অবশ্য পূর্বেই নির্দিষ্ট করে বলেছি গল্প-উপন্যাসের কথা। আধুনিক কালের জনপ্রিয় শাখা হচ্ছে গল্প-উপন্যাস। মূলত কর্পোরেট ঈদসংখ্যাগুলোতে প্রতারণা করা হয়, গল্প-উপন্যাস নিয়েই। আমার জানামতে, কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী, নাটক প্রভৃতি নিয়ে এই প্রতারণাটি হয় না। অর্থাৎ যারা কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, স্মৃতিকথা, দেন কর্পোরেট ঈদসংখ্যায়; সেগুলো পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় অবিকৃতই থাকে। যেহেতু সাহিত্যের গল্প-উপন্যাস শাখার পাঠকপ্রিয়তা প্রচুর, সেহেতু কর্পোরেট পুঁজি সেটাকে ব্যবহার করে তার মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে। পুঁজি মুনাফা অর্জনের প্রয়োজনে যা করণীয় তা তো করবেই; কিন্তু লেখক তাঁর লেখাটি (গল্প-উপন্যাসটি) অর্ধ-লিখিত, কিংবা অসম্পূর্ণ অবস্থায় কেন বিকিয়ে, পাঠকের সাথে এই প্রতারণা করেন? পুঁজির ধর্ম মুনাফা, কিন্তু আমাদের লেখকের ধর্ম কী? কর্পোরেট ঈদসংখ্যায় একবার লেখক অর্ধ-লিখিত তাঁর পণ্যটি বিক্রি করবেন, আরেকবার সম্পূর্ণ লিখে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে, তখনো তার মূল্য হাঁকবেন– তা কী হতে পারে! আমার প্রশ্নটি সেই জায়গায়, আপনি লেখক যদি জানতেনই লেখাটির পরিবর্তন-পরিমার্জন দরকার– তাহলে সেই অসম্পূর্ণ লেখাটি কেন বিক্রি করলেন? এতে কী একই পণ্য বারবার বিক্রির অনৈতিকতা করছেন না লেখক? আমাদের শ্রদ্ধেয় লেখক হওয়ার পরও যে আপনি একাধিক কর্পোরেট ঈদসংখ্যায় লিখবার তাড়নায় বা লোভে পাঠকের সাথে প্রতারণা করছেন; একবারও কী ভেবেছেন, এর পরিণাম কী? ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত আপনাদের ভুয়া লেখা পড়ে প্রতারিত হতে হতে একদিন পাঠক আপনাদের লেখা আর পড়বে না। আর তখন কর্পোরেট পুঁজি যাবে, আপনার লেখায় পাঠকের আস্থা নেই; ফলে আপনাকে দিয়ে পুঁজির আর ব্যবসায় হবে না– পুঁজিও মুহূর্ত বিলম্ব না করে আপনাকে ছুঁড়ে ফেলবে আস্তাকুঁড়ে।