Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • নাটোরে বৈশাখী মেলার নামে জুয়া খেলা বন্ধ করেছে জেলা প্রশাসন– বিস্তারিত....
  • রাবির আবাসিক হলে এইচএসসির অমুল্যায়িত খাতা!– বিস্তারিত....
  • জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর : এরশাদ– বিস্তারিত....
  • নাটোরে বৈশাখী মেলায় প্রকাশ্যে জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য– বিস্তারিত....
  • প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে নগরীতে প্রকৃতি বন্ধন– বিস্তারিত....

অদ্ভুতুড়ে । এম. আসলাম লিটন

জুন ১৭, ২০১৬

টিটন কাঁসার থালার দিকে ঝুঁকে যায়। থালার পানিতে নিজের অবয়বের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে ওঠে। চিৎকার দিয়ে ওঠে। সত্যিই তো পানিতে যে প্রতিবিম্ব তা টিটনের নয়। আস্ত একটা বিদঘুটে ভূতের অবয়ব। খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় টিটন। গুরু, সত্যি আপনি অসাধারণ সাধক! আপনি যে-সে ব্যক্তি নন। আজ থেকে আপনি গুরু। মহাগুরু। বলেই কদম্বকালিনী ওঝার পায়ে পড়ে যায় টিটন।

পর্ব-২
পরদিন সোজা গিয়ে সে কদম্বকালিনী ওঝার পায়ে পড়ে যায়। বাবা আমার বহুদিনের শখ, প্রাণের স্বপ্ন আমি ভূত হতে চাই। আপনিই পারেন আমাকে ভূত বানিয়ে দিতে। আমাকে নিরাশ করবেন না বাবা। আমি একবুক আশা নিয়ে এসেছি আপনার কাছে।
কদম্বকালিনী ওঝা ভড়কে যান। এমন আবদার তিনি জন্মেও শোনেননি। শুনবেন কী করে? ভূতে ধরলে সবাই তার কাছে আসে ভূত তাড়াতে। সাপে কাটলে আসে বিষ নামাতে। ভূতকে মানুষ ভয় করে যমের মত! ভূতের নাম শুনলে সে পথ আর জন্মেও মাড়ায় না কেউ। আর এই পুচকে দুধের শিশু কি না এসেছে ভূত হতে! এরকম ইচ্ছার কথা যে শুনবে সেই ভড়কে যাবে। কদম্বকালিনী ওঝা ভাবলেন, ছেলেটি পাগল অথবা মতলববাজ। তিনি টিটনকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দিলেন।
তাড়িয়ে দিলে কী হবে, টিটন নাছোড়বান্দা। তিনি যতবারই ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দেন, টিটন ততবারই ছুটে এসে পা আঁকড়ে ধরে। আমাকে ভুল বুঝবেন না বাবা। আমি পাগল না বাবা। আমি বড় আশা করে এসেছি বাবা। আমাকে নিরাশ করবেন না বাবা। আমার অনেকদিনের স্বপ্ন বাবা। জীবনে একবার ভূত হয়ে দেখতে চাই বাবা। আমি জানি আপনি মস্তবড় ওঝা! মস্তবড় সাধক! আপনার মত এতবড় সাধক আমি জন্মে দেখিনি। ভূতরা আপনাকে যমের মত ভয় পায়। আপনি যখন ভূত তাড়াতে পারেন, তার মানে আপনি ভূত বানাতেও পারেন। আপনি রাজি না হওয়া পর্যন্ত আপনার পা ছাড়ব না বাবা!
টিটনর এই কান্নাকাটি আর আকুতিতে কদম্বকালিনী ওঝার মন একটু গলল। তিনি চিন্তা করলেন, জীবনে তো অনেক রকম তন্ত্র-মন্ত্র শিখেছি। সেগুলো ঘেঁটে-মেটে একবার দেখাই যাকনা মানুষকে ভূত বানানো যায় কী না! একবার সফল হলে তার নামডাক বেড়ে যাবে। তান্ত্রিক দুনিয়ায় সাড়া পড়ে যাবে। আর তিনি হয়ে উঠবেন তান্ত্রিকদের গুরু। দুনিয়ার তাবদ তান্ত্রিকরা তার পদানত হবে। এটাও বা কম কিসে! আর সফল না হলেও তো কোন ক্ষতি নাই। কেউ জানতেও পারবে না।
তিনি রাজি হলেন। কিন্তু একটা শর্ত দিলেন। কোন মানুষতো দূরের কথা, ঘটনাটা কাকপক্ষিকেও বলা যাবে না। টিটন লাফ দিয়ে উঠল। একটা কেন, হাজারটা শর্ত সে মানতে রাজি!
কদম্বকালিনী তাকে পরদিন কাকডাকা ভোরে আসতে বললেন। ততক্ষণে এতদিনের শেখা তন্ত্র-মন্ত্রগুলো ঝালিয়ে নেয়া যাবে। টিটন তাতেই খুশি। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে এলো।
সেই রাতে টিটনর ঘুম ধরে না। তার এতদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আনন্দে তার মন ধিতাং ধিতাং করে নাচছে। তাথৈ তাথৈ করে নাচছে। অদ্ভুত সব স্বপ্নও দেখে ফেলে সে রাতে।
কিন্তু ঠিকই আঁধার রাতে ঘুম ভেঙে যায় টিটনের। ধড়ফড় করে উঠে বসে। সবার অজান্তেই বাড়ি থেকে বের হয়ে ছুট দেয় কদম্বকালিনী ওঝার বাড়ির দিকে। যথা সময়ে পৌঁছে যায় আস্তানায়। কদম্বকালিনী ওঝা টিটনকে সামনে বসিয়ে যথারীতি যজ্ঞ শুরু করেন। এই যজ্ঞ সফল হলে লাভবান হবে দুজনেই। তাই কদম্বকালিনী ওঝাও বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন।
কদম্বকালিনী মন্ত্র পড়ে অগ্নিতে ঘি ছিটান। আগুন দাও দাও করে জ্বলে ওঠে। আগুন থেকে অদৃশ্য বাতাস নিয়ে ছুঁড়ে মারেন সামনে বসে বুদ্ধাসনে চোখ বন্ধ করে বসে থাকা টিটনের দিকে। কোন কাজ হল না। টিটন চোখ ঈষৎ ফাঁক করে নিজেকে দেখে। না সে ভূত হয়নি। এখনো সে টিটনই রয়ে গেছে। কদম্বকালিনী ওঝা আরেকবার মন্ত্র পড়ে অদৃশ্য বাতাস ছুঁড়ে মারেন টিটনের গায়ে। এবারও কাজ হল না। টিটন টিটনই রয়ে গেল, ভূত হল না। কদম্বকালিনী ওঝা এবার ব্যতিব্যস্ত হয়ে দীর্ঘ একটা মন্ত্র পড়লেন। এবার পরপর দুবার অগ্নিতে ঘি ছিটালেন। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাতাস মুঠোয় ভরে ছুঁড়ে মারলেন টিটনের শরীরে। টিটন আর চোখ খুলছে না। সে চোখ খুলে আর নিরাস হতে চায় না।
কদম্বকালিনীর গম্ভীর ভারী কণ্ঠের অট্টহাসিতে প্রকম্পিত হল চারিদিক। সে হাসি আস্তানার দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। এ কোন মানুষের হাসি নয়। যেন এক আস্ত পিশাচ হুংকার দিচ্ছে। অসম্ভব ধরনের ভয় টিটনকে গ্রাস করল। সে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। ঠিক সেই সময় কদম্বকালিনীর থঢ়হড়কম্পিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, চোখ খোল বৎস্য! নিজেকে অবলোকন কর! তুমি আর কোনো মনুষ্য সন্তান নও! কদম্বকালিনী ওঝার অভূতপূর্ব কারসাজিতে মানুষ থেকে ভূতে পরিণত হয়েছ!
অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে যায় টিটনের সমস্ত শরীরে। একি সত্যি শুনছে! সে কি তবে এখন ভূত! মানুষ নয়! চোখ খুলে দেখার সাহস পাচ্ছে না টিটন। চোখ খোল! দেখ নিজেকে! কদম্বকালিনীর ধমকে আচমকা চোখ খোলে সে।
নিজের চেহারা দেখতে পাচ্ছে না সে। তবে হাত-পা, শরীরের যে সব অংশ চোখে পড়ছে তাতেই নিঃসন্দেহ টিটন। এ মানুষের শরীর নয়। লোমস এক ভূতের শরীর। ভয়ে ভয়ে তার কণ্ঠ থেকে ক্ষিণ শব্দ বের হয়ে আসে। আমি কি ভূত হয়েছি বাবা?
ভূত নয়, ভূতের বাবা। নিজেকে দেখে বুঝতে পারছ না?
কিন্তু দেখবে কিভাবে? নিজের মুখ কি নিজে কেও দেখতে পায়? আয়না লাগবে আয়না। একটা আয়নার জন্য ওর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। বিষয়টা বুঝতে পেরে কদম্বকালিনী ওঝা তার সামনে একটা কাঁশার থালা এগিয়ে দেন। পিতলের ঘট থেকে পানি নিয়ে থালায় ঢেলে দেন। দেখ! নিজের চেহারা দেখ! তুমি এখন মনুষ্যসন্তান নও। তুমি এখন ভূত। কদম্বকালিনী ওঝার সৃষ্টি ভূত!
টিটন কাঁসার থালার দিকে ঝুঁকে যায়। থালার পানিতে নিজের অবয়বের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে ওঠে। চিৎকার দিয়ে ওঠে। সত্যিই তো পানিতে যে প্রতিবিম্ব তা টিটনের নয়। আস্ত একটা বিদঘুটে ভূতের অবয়ব। খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় টিটন। গুরু, সত্যি আপনি অসাধারণ সাধক! আপনি যে-সে ব্যক্তি নন। আজ থেকে আপনি গুরু। মহাগুরু। বলেই কদম্বকালিনী ওঝার পায়ে পড়ে যায় টিটন। ওঝা ওকে তুলে দাঁড় করিয়ে দেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলেন- আজ থেকে তুমি কদম্বভূত! তোমার ক্ষমতা অপার! তোমার শক্তি অপার! কেউ তোমাকে পরাভূত করতে পারবে না। তবে মনে রেখ, তোমার মধ্যে যে অপার ভূতীয় শক্তি কাজ করছে তাকে অপচয় করো না। এই শক্তি দিয়ে কারো কল্যাণ করতে না পারো, অকল্যাণ করো না।
কদম্বভূত রূপি টিটন বলে, আপনার আজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে মহাগুরু কদম্বকালিনী। আমাকে বিদায় দিন। কদম্বকালিনী ওঝা হাত উঁচিয়ে বলেনÑ তথাস্ত বৎস্যে! তোমার বাঞ্ছা পূর্ণ হোক!
অবশেষে টিটনরূপী কদম্বভূত বিদায় নিয়ে আস্তানার বাইরে আসে। সে ভীষণ উৎফুল্ল! ভীষণ খুশি! এখন থেকে সে যা ইচ্ছে করতে পারবে। যেখানে ইচ্ছা যেতে পারবে। যে রূপ ধারণ করতে ইচ্ছে করে করতে পারবে। এই তো তার এতো দিনের ইচ্ছে ছিল। কদম্বভূতের প্রথম ইচ্ছে জাগল, সে অদৃশ্য হয়ে যাবে তারপর তার বাড়িতে গিয়ে প্রথম তার বোন টিটুলকে ধন্যবাদ দেবে। কিন্তু কদম্বভূতরূপী টিটন যতবারই অদৃশ্য হওয়ার প্রস্তুতি নেয়Ñ ততবারই ব্যর্থ হয়। কী ব্যাপার! হচ্ছে না কেন? সে অদৃশ্য হতে পারছে না কেন? কী ঘটল?