রাত ১১:৪৬ বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯


৮৩% স্কুলের পাশে তামাক, নতুন প্রজন্মকে মেধাশূন্য করার অপচেষ্টা

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : June 30, 2019 , 4:24 pm
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

বিভিন্ন জায়গায় চলাফেরা করতে গিয়ে হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের চোখের সামনে পড়ে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখতে পাই অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেই হরেক রকমের দোকান। তবে দোকান থাকাতে ক্ষতির কিছু নেই।

কিন্তু নতুন প্রজন্মকে তামাকের ভয়াল ছোঁবলে আকৃষ্ট করতে তামাক কোম্পানিগুলো নানা অপচেষ্টায় ব্যস্ত। কূটকৌশলের অংশ হিসেবে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশের দোকানগুলোতে মালিককে তামাকপণ্য বিক্রির লোভনীয় অফার দেয়। অবৈধ পুরস্কার-প্রনোদনা প্রদানের মাধ্যমে দোকানগুলোতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটে সয়লাব করে দেয়া হয়। নতুন প্রজন্মকে ধূমপানে আকৃষ্ট করতে ধূমপায়ীদের জন্য দেওয়া হয় লোভনীয় অফার।

তামাক কোম্পানীগুলোর এসব অবৈধ কূটকৌশলের ফসল আজ রাজশাহী বিভাগের ৮৩% স্কুলের পাশে বিক্রি হচ্ছে মানুষের নিশ্চিত মৃত্যুর গ্যারান্টিযুক্ত একমাত্র পণ্য তামাক।

সম্প্রতি ‘বিগ টোব্যাকো টাইনি টার্গেট’ নামে একটি গবেষণার জরীপে রাজশাহীর উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’ এমন লোমহর্ষক পরিসংখ্যান দিয়েছে। এমন ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যানে আমরা সত্যি হতবিহ্বল। এটি রাজশাহী বিভাগের পরিসংখ্যান। সারাদেশের চিত্র প্রায় একই রকম কিংবা এর চেয়েও ভয়াবহ।

কোনো কোনো স্থানে প্রায় শতাভাগ স্কুলের পাশে তামাকপণ্য বিক্রি হয়। এমন পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনি সংকেত। এমন পরিসংখ্যানে মনে হচ্ছে, নতুন প্রজন্মকে তামাক সেবনের মাধ্যমে মেধাশূন্য করতে কোম্পানিগুলো অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।

ঢাকা আহ্সানিয়া মিশনের নেতৃত্বে ২০১৭ সালে দেশব্যাপী চলা (সম্প্রতি ফল প্রকাশিত হয়েছে) এসিডি’র এ গবেষণা জরীপে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, রাজশাহী বিভাগের ৮৩% স্কুলের পাশে তামাকপণ্যের দোকানগুলোর ৭৭%-ই ক্ষুদ্র মুদির দোকান। স্কুলের সামনে রাস্তার পাশে ১২% দোকানে শুধু বিভিন্ন ধরনের তামাকপণ্য বিক্রি হয় বলে জরীপে ফলাফলে আমরা দেখেছি।

তাহলে এখানে বিষয়টি কী দাঁড়ালো? স্কুলের পাশে বিভিন্ন ধরনের দোকানকে শতভাগ ধরে ৭৭% মুদির দোকানে তামাকপণ্য পাওয়া যায়। মনে হচ্ছে, এটি তামাক কোম্পানিগুলোর একটি বড় ধরনের কৌশল। কেননা- একটি কলম বা খাতা, কিংবা কোনো খাবার কিনতে শিক্ষার্থীদের ওই ক্ষুদ্র মুদির দোকানে যেতে হয়। দোকানের নাকের ডগায় তামাকপণ্যের পসরা সাজিয়ে রাখার ফলে প্রতিনিয়ত দেখতে দেখতে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে নিঃসন্দেহে এই পসরা প্রভাব ফেলবেই।

গবেষণায় আরেকটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান উঠে এসেছে আর তা হলো- রাজশাহী বিভাগে ৮৬% তামাকপণ্যের দোকানে শিশুদের দৃষ্টি সমান্তরালে (আনুমানিক ১ মিটার) তামাকজাত দ্রব্যের ডিসপ্লে রয়েছে। আর ৮৬% তামাকপণ্যের দোকানে চকোলেট এবং খেলনার পাশে তামাকজাত দ্রব্য রেখে বিক্রি হয়। এমন লোমহর্ষক পরিসংখ্যান আমাদেরকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

শিশুদের দৃষ্টির সোজাসুজি তামাকপণ্যের ডিসপ্লে এবং চকোলেট, খেলনা কিংবা মুখরোচক কোনো খাবারের সঙ্গে রেখে তামাকপণ্য বিক্রি করা তামাক কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের ব্যবসায়ীক কৌশল। এটির উদ্দেশ্য হলো- কোমলমতিরা দোকানের সামনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তামাকের বিজ্ঞাপন দেখতে পেলে তাদের মনোজগতে এটির প্রভাব ফেলবে। এছাড়া যেটি কিনতে যাবে সেটির সঙ্গে সুন্দর প্যাকেটে মোড়ানো তামাকপণ্য দেখতে পেয়ে তা সেবনে প্রলুব্ধ হবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিশ্চিত ধ্বংস আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার এমন ভয়ানক পরিসংখ্যান প্রত্যক্ষ করতে সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে, এর আগে ইংরেজরা ভারতবর্ষকে প্রত্যক্ষভাবে দু’শো বছর শাষণ করেছে।

কিন্তু কিছু বিষয়ে এদেশে তারা তাদের খবরদারি এখনো ধরে রেখেছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার মুনাফা অর্জন। তামাকের বহুজাতিক এ কোম্পানিটির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিনিময়ে তারা আমাদেরকে বছরে লাখো অকাল মৃত্যু উপহার দিচ্ছে। মৃত্যুর পথযাত্রী হচ্ছে লাখ লাখ তামাকসেবী।

কিন্তু এভাবেই কী চলতে থাকবে? বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যুর লাশের ওপর পা রেখে তামাকের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা কি এভাবেই চালাতে থাকবে? তামাকখাতে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয় এটি ঠিক কিন্তু তার চেয়ে দেড় গুণ টাকা ব্যয় হয় তামাক সেবনের ফলে সৃষ্ট রোগে চিকিৎসা বাবদ।

বছরে লাখো মানুষ তামাক সেবনে অকালেই মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ার ভয়াবহ পরিসংখ্যানের দিকেও নজর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। কাজেই দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম ধ্বংসে তামাক কোম্পানিগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে যে মরণফাঁদ পেতে রেখেছেন তা বন্ধে কর্তৃপক্ষকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ৮৩% স্কুলের পাশে তামাকপণ্যের এমন কৌশলী ও বিধ্বংসী ব্যবসা বন্ধ করুন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য আগামীতে দেশ পরিচালনায় যারা নেতৃত্বে দিবেন সেই মেধাবী প্রজন্মকে তামাকের কড়ালগ্রাস থেকে করুন মুক্ত। বাস্তবায়ন করুন ২০৪০ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন।

লেখক: শরীফ সুমন, সিনিয়র সাংবাদিক।