রাত ১০:০১ সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯


হাতি || ফেদেরিকো ফালকো

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : আগস্ট ২৯, ২০১৯ , ৮:৩৫ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : শিশিরবিন্দু
পোস্টটি শেয়ার করুন

ছোটগ্রল্প|| ফেদেরিকো ফালকো

সার্কাসের দলটা ছোট শহরটায় পৌঁছেই স্টেশনের পাশের রেলওয়ের জমিটাতে তাঁবু খাটাতে শুরু করে দিল। তিনদিন লাগল তাদের। শুরুতে তারা জমির মাঝখানটায় বিশাল একটা বৃত্ত আঁকল, তারপর বৃত্তের মাটি সমান করে সার্কাসের রিং বানাল। বৃত্তের চারপাশে তারপর একে একে এনে জড়ো করতে শুরু করল ট্রেইলার, ওয়াগন আর বাঘ-সিংহের খাঁচাগুলো। আর বেশ খানিকটা দূরে, দ্বিতীয় দিনে এসে তারা পুরো সকালটাই ব্যস্ত রইল খুঁটি নিয়ে। ওদের হাতুড়ির খুটখাট শব্দে ভরে রইল পুরো শহরটা। বিকালের দিকে দীর্ঘকায় আকশিগুলো খাড়া হতে শুরু করল। একদল লোক মোটা একটা দড়ির প্রান্ত ধরে টান দেয়, আর হেইয়ো বলে চেঁচিয়ে ওঠে। টি-শার্ট পরা একজন বৃদ্ধ লোক হলো তাদের নির্দেশদাতা। তারপর একসময়ে মূল আকশিটা একটা পালের আকৃতি নিয়ে খাড়া হয়ে গেল।

শেষদিনে খুঁটিগুলো সব তেরপলে ঢেকে দিয়ে তাঁবু খাটানোর কাজ শেষ করে আনল।

ইত্যবসরে সার্কাস শোর কঙ্কালসার মহিলাটা যে উড়ুক্কুর খেলা দেখায়, সে গাছের ডালে কাপড় শুকাতে দিয়ে তার মোবাইল হোমের পাশে ম্যাগাজিন খুলে বসেছে। আর, আরো দূরে, দেখা যায় নানারকম শারীরিক কসরত দেখানো লোকটা তার ট্রেইলারের ছাদে হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে আছে চিৎ হয়ে, সংক্ষিপ্ত পোশাকের শরীরে রোদ খাওয়াচ্ছে সে, আর জাদুকর লোকটা বিশালাকৃতির একটা কাচের বাক্স ঘষায় ব্যস্ত।

***

শহরের বাসিন্দারা তাদের কুকুর-বেড়ালগুলোকে ঘরের ভেতরে বন্দী করে ফেলেছে। কারণ তারা শুনেছে, সার্কাসের লোকেরা পোষা জন্তু-জানোয়ার ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের পশুগুলোর উদরপূর্তি করায়। মায়েরাও তাদের ছেলেমেয়েদের রেললাইনের ধারেকাছে ভিড়তে দিচ্ছে না। তাদের ভয় বাচ্চাদের চুরি করে নিয়ে গিয়ে ওরা শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ওদের সার্কাসের দড়াবাজ কিংবা ভোজবাজিকরে পরিণত করবে। তবে ব্যাপার যাই হোক, স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাচ্চারা ঠিকই হাজির হলো সিংহকে কীভাবে খাওয়ানো হয় দেখার জন্য। তারপর রাস্তা থেকেই ঘোরাফেরার ফাঁকে ফাঁকে তারা ঠিকই চোখ রেখে গেল সার্কাসের বাকি কর্মকাণ্ডের ওপর : বানরের উকুনের তাড়সে শরীর চুলকানোর দৃশ্য। বিস্কুট ছুড়ে দেয়া এক লোকের পেছনে নাচের কুকুরগুলোর মরিয়া ছোটাছুটি। দুটো সাদা ঘোড়া, যার একটির লেজ একেবারে মাটি পর্যন্ত ছুঁয়েছে। আর দেখল একটা হাতি। ছাইরঙা। নিখুঁত। খুব উঁচু। আর সামান্য বিমর্ষ।

***

প্রথম শোর সব টিকিট শুরুতেই বিক্রি হয়ে গেল। শো দেখনেওয়ালাদের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করল সার্কাসের বিস্ময়কর সব খেলার বর্ণনা : মানুষ কামানের গোলা, মানুষ দিয়ে বানানো পিরামিড, ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে এক নারীর থুতু ফেলার মতো করে আগুন ছুড়ে মারা, সিংহ আর সিংহের প্রশিক্ষকের কসরত, ভাঁড়ের সঙ্গে পোশাক পরা টুপিমাথায় এক ক্ষুদে বাঘের খেলা। এতে যা হলো, যারা টিকিটবঞ্চিত হয়েছে, তাঁরা পরের সপ্তাহের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল চিন্তিতমুখে। আর দেখনেওয়ালারা গর্বে বেশ একটা রোয়া ফোলানো ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

***

সার্কাস মালিকের এক ছেলে, সার্কাস নতুন কোনো শহরে পৌঁছলেই ছেলেকে সে স্থানীয় স্কুলে পড়তে পাঠায়। ক্লাস সিক্সে পড়ে ছেলেটা। স্কুলের ছেলেমেয়েরা তাকে পেয়ে ঘিরে ধরল, তার কাছ থেকে তার সহস্র অভিযানের গল্প শুনতে চায় তারা। ছেলেমেয়েগুলো ধরেই নিয়েছে, সার্কাসের জীবন নিশ্চিতভাবেই অনন্যসাধারণ ঘটনায় ভরপুর। কিন্তু ছেলেটা, সার্কাসের কোনো গল্প বলতে সোজা অস্বীকৃতি জানাল। সবকিছু থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়া কঠিন, ক্ষমাহীন চোখের এক ছেলে সে। নিজেকে অন্যদের কাছে, একজন উদ্ভট হিসেবে উপস্থাপিত হওয়াকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে সে। টিফিন পিরিয়ডেও সে বাইরে যায় না, নিজের ডেস্কেই বসে থাকে, জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখে। দিনশেষে আসন্ন শোর ঘোষণারত দুই স্পিকারওয়ালা একটা পুরনো রাসত্রোহেরো পিকআপ হাজির হয় ওকে নেয়ার জন্য প্রতিদিন। আর প্রতিবারই ভাঁড়ের রেকর্ডকৃত ওই বিজ্ঞাপন ঘোষণার আওয়াজ নিকটাবর্তী পিকআপ থেকে যত উচ্চগ্রামে উঠতে থাকে, সার্কাসবালকের মুখ তত লাল হতে থাকে।

তারপর দিনশেষে দিনের কার্যক্রমের মধ্যে বাকি থাকে কেবল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পতাকা নামানো।

এক সকালে স্কুলের ঘণ্টা পড়ার আগেভাগেই সার্কাসের ছেলেটার সহপাঠী এক মেয়ে দৌড়ে এসে ক্লাসে ঢুকল। তারপর ত্বরিত এক চুমু খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু সার্কাসের ছেলেটা পেছন থেকে মেয়েটার চুল টেনে ধরে পুনরায় তাকে নিজের দিকে টেনে আনল চুমু খাওয়ার জন্য। পুরো মুখ স্ফূরিত করে বিরাট হাঁ করে যেন গিলে নিতে চাইল সে মেয়েটাকে। জিহ্বা ঠেলে দিয়ে মেয়েটার ঠোঁটজোড়া মুড়ে নিল নিজের মুখের ভেতর। তারপর মেয়েটার মুখের ভেতরে গোলাপি গহ্বরে কৌতূহলী বালক চালান করে দিল একদম স্বাদহীন, রঙহীন এক মিন্ট গামের পিণ্ড। বাকি ছাত্ররা যখন ক্লাসে ঢুকল, মেয়েটা তখন কাঁদছে তার ডেস্কে বসে, দুই পা চেপে একত্রে রেখে, আর স্কুল ইউনিফর্ম উঠে আছে হাঁটুর উপরে। সার্কাসবালক জানালায় ফিরে গিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে।

বেশি সময় লাগল না, গুজব দ্রুত উপরের ক্লাসগুলো পর্যন্তও পৌঁছে গেল। তারা বলাবলি করল, সার্কাসের ছেলেটা তার ক্লাসের এক মেয়েকে স্কুলমাঠের পেছন দিকের আঙুরলতায় ছাওয়া গাছটার গর্তের কাছে নিয়ে গিয়ে মেয়েটাকে বিবস্ত্র করেছে। তারা কসম খেয়ে বলল, ওরা দুজনই ওখানে নেতিয়ে পড়েছিল।

গুজবে প্রিন্সিপাল খুব একটা গা করল না, কিন্তু তার পরও সাকার্সবালককে তার অফিসে ডেকে পাঠালেন তিনি। সেখানে দীর্ঘ বিশদ এক সাক্ষাৎকার নেয়া হলো তার। প্রিন্সিপাল জিজ্ঞাসাবাদে জানতে চাইলেন, নতুন স্কুল তার কেমন লাগছে। সে তার সহপাঠীদের সঙ্গে ঠিকঠাকমতো মানিয়ে নিতে পারছে কিনা। সার্কাসবালক অল্পই প্রশ্নের জবাব দিল।

***

একদিন আগাম কাউকে কোনো কিছু না জানিয়ে, সপ্তাহান্তের দুটো সফল শোর পরপরই সার্কাস দলটা শহর ছেড়ে চলে গেল। ছেলেটা আর স্কুলে ফিরল না। ভোরে, সার্কাসের মাঠের যেখানে তাঁবু ছিল, দেখা গেল সুনসান খালি পড়ে আছে। ফাঁকা মাঠটার এক পাশে থাকার মধ্যে শুধু দাঁড়িয়ে আছে একটা হাতি, বিশাল আর বিষণ্ণ, পা শিকলে বাঁধা মাটিতে পুঁতে রাখা একটা খুঁটির সঙ্গে।

পুলিশের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, সার্কাস দলের সঙ্গে পশু-পাখিদের যথাযথ কাগজপত্র নেই। সে কারণেই হাতিটাকে পেছনে ফেলে চলে গেছে ওরা। পশু চিকিৎসক এলো, হাতিটাকে পরীক্ষা করল।

হাতি খুবই অসুস্থ, জানাল সে। মৃত্যু থেকে বড়জোর এক কদম দূরে আছে পশুটা।

সবার মন খারাপ হয়ে গেল।

আপনার কিছুই করার নেই? পশুটাকে বাঁচানোর কোনো পথ নেই, জানতে চাইল সবাই।

পশুচিকিৎসক মাথা নেড়ে জানাল, না। ওর মরাটা কেবল এখন সময়ের ব্যাপার।

তাহলে এই মরা হাতি নিয়ে আমরা কী করব, জানতে চাইল তারা।

আমার জানা নেই, জবাব দেয় পশুচিকিৎসক।

এদিকে ছেলেমেয়েরা সব হাতির চারপাশে জড়ো হয়ে গেছে। তারা হাতির তলা দিয়ে পায়ের ফাঁক দিয়ে দৌড়ে আরেক পাশে চলে আসছে। খেলার নিয়ম হলো, হাতির পেটের তলা দিয়ে জন্তুটার অগোচরে পার হয়ে আসতে হবে। পরে ওরা হাতির লেজ ধরে ঝোলা শুরু করল। এর মধ্যে দলের দুষ্টের শিরোমণি যে ছেলেটা, সে গিয়ে হাতির পিঠে উঠে পড়ল। উপরে উঠে কিছুক্ষণ হাত নাড়ল, নাচানাচি করল, তারপর বিজয়ীর মতো হালকা এক শিস বাজিয়ে নিচে নেমে এলো।

রেলওয়ের জমির মাঝখানে হাতিটি দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চল। মাছি তাড়াতে কান পর্যন্তও নড়ে না তার। খাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। শুঁড় ডান দিকে হেলে থেবড়ে পড়ে আছে মাটিতে। আধবোজা চোখ ঘুমে ভারাক্রান্ত।

***

দুদিন পর মারা গেল ও।

মরা হাতি নিয়ে কী করবে কেউ জানে না। পায়ের সঙ্গে জড়ানো শিকলের তালাটা ভেঙে ফেলা হলো, মুক্ত হলো হাতিটা। তারপর এক খননযন্ত্র আর কিছু লোকের সাহায্যে ট্রাকে তুলে ওকে আস্তাকুঁড়ে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসা হলো। আস্তাকুঁড়ই ওর শেষ আশ্রয় হলো।

***

এরপর কিছুদিন মরা হাতিটার ওপরেই খেলাধুলা করল ছেলেমেয়েরা। একসময় ওদের যাওয়াও থেমে গেল। ততদিনে গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে ও।

***

খাল-বাকলহীন শুকনো হাতিটার যখন আকৃতিহীন এক ঢিবি ছাড়া আর কিছুই রইল না, মেয়রের তখন ওর কথা মনে পড়ল। কিছু জোগাড়যন্ত্রে লেগে গেল সে। কঙ্কালটা ফরমোসার দূরের এক প্রদেশের ন্যাচারাল সায়েন্সের জাদুঘরের কাছে বিক্রি করে দিল। এ বিক্রিতে ছোট শহরটি বেশ লাভবানই হলো।

এরপর তিনজন প্রকৌশলীর একটা দল হাজির হলো। দুদিন ধরে হাড়গোড় সব ব্লিচ দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে খানিক দূরের কাঠের বাক্সে ভরে রাখতে শুরু করল। কাজ শেষ করে, একটা ঝরঝরে ভ্যানে সবকিছু বাঁধাছাদা করে নিয়ে চলে গেল তিন প্রকৌশলী। জাদুঘরটার প্রবেশমুখেই, একটু অন্ধকার হলেও বেশ রাজকীয় এক হলঘর রয়েছে। ওটার মাঝখানে হাতিটাকে বেশ আকর্ষণীয়ই দেখাবে। হাড়গোড় সব জোড়া দিয়ে ওকে পুনর্নির্মাণ করতে প্রায় দেড় বছর লেগে গেল ওদের। দিনের পর দিন, গোপন লোহার একটা কাঠামোর ওপর একটা একটা করে হাড় জোড়া দিয়ে গেল ওরা। আর পুরো কাজটায় পুরনো প্রাণীতত্ত্বের একটা বিশ্বকোষ সহায়িকা হিসেবে সর্বক্ষণ কাছে থাকল ওদের। প্রত্যেকটা অঙ্গ, জোড়সন্ধি, তুচ্ছাতিতুচ্ছ সবকিছু খুঁটিয়ে মিলিয়ে নিল ওরা। ধীরে ধীরে হাতিটা আকৃতি পেল। এবং কাজ প্রায় শেষ, এ সময়েই তারা টের পেল, হাতিটার লেজের ছোট্ট একটা হাড়, কশেরুকা অস্থি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাণী বিশ্বকোষের মতে, মোট ১৯টি কশেরুকা হাড় থাকার কথা, কিন্তু বাক্সে আছে কেবল ১৮টা।

আরো কয়েকবার পুরো বাক্সটা খোঁজা হলো তন্ন তন্ন করে, শেষে হাল ছেড়ে দিল তারা। পরস্পরকে বলল, ছোট ওই হাড়টা নিশ্চিত ওই শহরেই কোথাও রয়ে গেছে; আস্তাকুঁড়ের আলুর খোসা, নাইলনের ব্যাগ আর ভাঙা বোতলের নিচে চাপা পড়ে আছে।

কিন্তু ঘটনা এরকম নয়। সার্কাসের ছেলেটাকে যে মেয়েটা চুমু খেয়েছিল, ওটা রয়ে গেছে তার কাছেই। সবার অলক্ষে, গ্রীষ্মের এক রাতের আঁধারে খটখটে হয়ে থাকা, নড়বড়ে ময়লার গাদা থেকে কশেরুকা হাড়টা চুরি করে নিয়ে আসে সে।

হাড়টা একটা গোলাপিরঙা ফিতা দিয়ে মুড়ে, তার ডায়েরি আর শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া চুইংগামের সেই পিণ্ডটার সঙ্গে, তার কাপড় রাখার আলমারির গোপন এক দেরাজে রেখে দিয়েছে সে।

এটা তার স্মৃতিচিহ্ন।

এসবি/জেআর