রাত ২:৪৮ সোমবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯


সুন্দরবন নিয়ে উদাসীনতা কি এবার কাটবে

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : নভেম্বর ১৩, ২০১৯ , ৫:৫১ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

. এম এ আজিজ : সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার উপকূলীয় এলাকাজুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই বনের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে পড়েছে। বাকি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চব্বিশ পরগনায় অবস্থিত। আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে সুন্দরবনের আয়তন ছিল বর্তমানের দ্বিগুণ। ওই সময় বৃহত্তর যশোর ও বরিশালের সমগ্র অঞ্চল ছিল সুন্দরবন। বর্তমানে সুন্দরবন উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৯০ কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৮৫ কিলোমিটার। টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ঢাকার সীমানা বিবেচনায় নিলে সুন্দরবন প্রায় ২০টি ঢাকা শহরের সমান।

ঐতিহাসিক সময় থেকে এ অঞ্চলের মানুষ জীবন ধারণের প্রায় সব উপকরণই সুন্দরবন থেকে আহরণ করত। আবার প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয়ে এক বিশাল প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে সুন্দরবন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ৯ নভেম্বর শনিবার বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ কীভাবে আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলার মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হ্রাস করেছে, তার কিছুটা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম।

আমাদের সামগ্রিক জীবনের ওপর ভারসাম্যপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশের যে অবদান, সেটির অর্থমূল্য আমরা স্বচক্ষে দেখি না বলে পরিবেশের মূল্য আমাদের কাছে তেমনটা গুরুত্ব পায় না। একজন সাধারণ মানুষের কাছে তাই সুন্দরবন শুধুই একটি বন; বড়জোর মাছ দেয়, মধু দেয়, কাঠ দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সুন্দরবন আমাদের চোখে অদৃশ্যমান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। সেটি হলো ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোন থেকে আমাদের প্রতিরক্ষা দিয়ে আসছে। ভৌগোলিক কারণে ভারত মহাসাগরে যেসব সাইক্লোন সৃষ্টি হয়, তার অধিকাংশই আমাদের উপকূলীয় এলাকায় কমবেশি আঘাত হানে। সুন্দরবন অনেকটা প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার মানুষ, ঘরবাড়ি ও ফসলাদি রক্ষা করে। যারা উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে, তারা জানে সিডর ও আইলার আঘাত থেকে সুন্দরবন কীভাবে মানুষ, গবাদিপশু ও ঘরবাড়ির একটি বড় অংশ রক্ষা করেছে।

স্বভাবগতভাবে আমরা সবকিছু আর্থিক মূল্যে বিবেচনা করি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি যেন নিয়তি। কিন্তু সরাসরি আর্থিক মূল্য ছাড়াও পরিবেশের নানা উপকারিতা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, সুন্দরবন আমাদের ২৪টি ইকোসিস্টেম সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, সুন্দরবনের প্রতি হেক্টর এলাকার ইকোসিস্টেম সেবার পরিমাণ বছরে ১০৫ মার্কিন ডলার থেকে ৮৪০ মার্কিন ডলার। এসব ইকোসিস্টেম সেবার মধ্যে উপকূলীয় এলাকা রক্ষা ও সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাস থেকে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস অন্যতম।

অতীতে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া দুটি প্রাসঙ্গিক ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণ করা একটি রিপোর্টের সারমর্ম পাঠকের জন্য এখানে উল্লেখ করি। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে একটি সাইক্লোন প্রবাহিত হয়। এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৪ কিলোমিটার। এতে প্রায় পাঁচ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। সাইক্লোনটি সুন্দরবন অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে আঘাত হানেনি। অন্যদিকে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর সুন্দরবনের ওপর দিয়ে ২১০ কিলোমিটার গতিবেগে বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানে। এতে ৩ হাজার ৩৬৩ জন মানুষ মারা যায়।

মোটামুটি গতিবেগ একই রকম হওয়ায় এ দুটি ঘূর্ণিঝড়ে মৃত মানুষের সংখ্যা, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু, মাথাপিছু আয়, সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের বার্ষিক ব্যয় ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে একটি তুলনামূলক আর্থিক মূল্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সুন্দরবন প্রতিবছর যেভাবে মানুষের জীবন রক্ষা করছে, তার আর্থিক মূল্য ১৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ম্যানগ্রোভ বনের ওপর পরিচালিত ১৩০টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০১২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম উপকূল রক্ষায় যে ভূমিকা রাখে, তার আর্থিক মূল্য হেক্টরপ্রতি প্রতিবছর গড়ে ২২৯ মার্কিন ডলার। এসব গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোনসহ উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় আমাদের সুন্দরবন যে ইকোসিস্টেম সেবা প্রদান করছে, তার আর্থিক মূল্য প্রতি হেক্টরে বছরে ৪৫৬ থেকে ১ হাজার ১৯২ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ পুরো সুন্দরবন এক বছরে ২৭ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৭১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ইকোসিস্টেম সেবা প্রদান করে থাকে।

এবার সুন্দরবনের ওপর দিয়ে উড়ে এল বুলবুল। এই সাইক্লোন প্রথমে ভারতের সুন্দরবনের সাগরদ্বীপে আঘাত হানে শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ। সাগরদ্বীপ সুন্দরবনের সর্বপশ্চিম-দক্ষিণে সাগর উপকূলে অবস্থিত। ঘণ্টায় প্রায় আট কিলোমিটার বেগে এগিয়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল শনিবার ভোরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আমাদের সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত এলাকা মান্দারবাড়িয়া দিয়ে প্রবেশ করে বলে আবহাওয়া অফিস জানায়। সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার বাতাসের গতিবেগের বুলবুল সাগরদ্বীপে প্রবেশের পর থেকেই ক্রমে দুর্বল হতে শুরু করে। ৮ কিলোমিটার গতিতে এগোতে থাকা ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ৮৫-৯০ কিলোমিটার বিস্তৃত আমাদের সুন্দরবন অতিক্রম করতে করতে একটি স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। আমাদের উপকূলবাসী বুলবুলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়। তেমন কোনো জলোচ্ছ্বাসও হয়নি। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইক্লোনের ফলে যে জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়, তার ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ শক্তি কমাতে সক্ষম ম্যানগ্রোভ বন।

পশুর নদ এখনো সুন্দরবনে লাইফলাইন। সুন্দরবনে যে পরিমাণ উজানের মিঠাপানি প্রবাহিত হয়, তার সিংহভাগ আসে পশুর নদের মাধ্যমে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে ১৯৭৫ সালের পর থেকে পশুর নদের পানির প্রবাহ কমেছে ৯০ শতাংশ। ফলে আগের তুলনায় সুন্দরবনে লবণাক্ততা বেড়েছে ৬০ শতাংশ। এর ফলে বনের গাছপালার ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সাতক্ষীরা ও খুলনার সুন্দরবনে সুন্দরী বৃক্ষ এখন বিরল। তুলনামূলকভাবে ছোটখাটো গরান সে জায়গা দখল করছে। ফলে ধীরে ধীরে বনের উচ্চতা হ্রাস পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।

সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে শুধু কথা আর কাগুজে সংরক্ষণে কাজ দেবে না। সুন্দরবন সন্নিহিত উত্তর-পূর্ব ২০ কিলোমিটার ইমপ্যাক্ট জোনের প্রায় ৭৭ লাখ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ৮০ ভাগ মানুষ সুন্দরবন থেকে সম্পদ আহরণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে ৯৫ ভাগ মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে এবং অধিকাংশই ভূমিহীন। নানা সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এদের জীবন-জীবিকার তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটেনি। সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিকল্প জীবিকার আওতায় আনতে হবে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস, অফুরন্ত জীবন-জীবিকার উৎস ও জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক ঢাল। চর্মচক্ষে এসব উপকারিতা আমরা খুব একটা দেখি না বলে সুন্দরবনের গুরুত্ব আমাদের কাছে উদাসীনতায় পরিণত হয়েছে। বুলবুল আমাদের সে উদাসীনতায় কি একটু নাড়া দিয়েছে?

. এম এ আজিজ: বাঘ গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক

এসবি/জেআর