রাত ৩:১০ সোমবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯


সহযোদ্ধা হারানোর ব্যথা আজও কাঁদায় মুক্তিযোদ্ধা হামিদকে

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : ডিসেম্বর ১, ২০১৯ , ১২:২২ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : রাজশাহীর সংবাদ,সাহেব-বাজার বিশেষ
পোস্টটি শেয়ার করুন

সাখাওয়াত হোসেন : মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহীর ৭নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হক সরকার। যুদ্ধ চালাকলে তার সহযোদ্ধা মন্টুও তার সাথেই লড়াইএ ছিলেন। মন্টু তখন ৭ম শ্রেণীতে পড়তো। তার বাড়ি বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানায়। যুদ্ধ চলাকালে তিনি মারা যান হামিদের কোলেই। সেই স্মৃতি এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় হামিদকে।

হামিদ তার কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, তারা তখন গেরিলা হামলা চালাতে যান আবদুলপুরের রাজাকার ক্যাম্পে। সেই সময় একটি গুলি হামিদের গলার পাশ ছিলে চলে যায়। তার রক্ত বের হচ্ছিলো। পাশেই দেখেন মন্টুর গুলি লেগেছে বুকে। তিনি দ্রুত কাঁধে নিয়ে নেন মন্টুকে। প্রায় ৫ কিলোমিটার দৌঁড়ে আসেন তাকে নিয়ে। কিন্তু মন্টুর ভাগ্য খারাপ। তিনি আর বেঁচে নেই। হামিদ আরও বলেন, তাকে ভারত নিতে যেতে পারেন নি তারা। তার মৃত্যুর পর তার লাশটিও আর দাফন করা হয় নি। ভাসিয়ে দেওয়া হয় পানির স্রোতে। এখনও মন্টুর এসব কথা মনে পড়লেই তিনি ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলেন। এর এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে গিয়েও চোখে পানি এসে যায় মুক্তিযোদ্ধা হামিদের।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে হামিদুল হক সরকার বলেন, ১৯৭১ সালে তিনি একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন বাঘা থানার আড়ানী কলেজে। সেই সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো তখন তিনি তার বন্ধু মাহিদুল আলমসহ ভারতে যান। তিনি ভারতে গেছিলেন এক আত্মীয়র বাড়িতে। সেখানে গিয়ে তিনি শুনেন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হচ্ছে। সেখান থেকে নন্দীভিটা ক্যাম্পে যান তিনি। এরপর সেখানে তিনি প্রথম নাম লেখান। তখন প্রথম ব্যাচ হিসেবে তাকে ও তার বন্ধুকে ট্রেনিংএ নিয়ে যাওয়া হয়। শিকারপুর মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় বিরভুম জেলার চাকুলিয়া নামের একটি পরিত্যক্ত এয়ার পোর্টে। সেখানেই হয় প্রথম হাতে খড়ি।

সেখান থেকে ১ মাস ১৭ দিন ট্রেনিং নেন। এরপর অনেক জেলার সাথেই তার রাজশাহী জেলার মোট ৬৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নেন। সেখান থেকে লালগোলা থানার ভবন নামক স্থানে আম বাগানে তাবু করে রাখা হয়। সেই সময় রাজশাহী বর্ডার খুব দূর্গম থাকায় তাদেরকে মেহেরপুর বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে পাঠান সেখানখান ট্রেনাররা। এরপর রাজ ভাই সহ আরও দু’্জন মিলে তারা শিকারপুরে কয়েকটি গেরিরা ফাইটে অংশ নেন। সেই সময় তার অভিজ্ঞতা হলো যে অচেনা জায়গায় গেরিলা অভিযান চালানো কঠিন। তাতে তাদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকবে। এরপর তারা রাজশাহী অঞ্চলে ফিরে আসেন।

এরপর তারা ফিরে প্রতিজন দুইটি করে গ্রেনেড নিয়ে হামলায় যেতেন। একটি করে হামলার জন্য আর একটি আত্মরক্ষার জন্য। তারপর থেকেই তাদের দেওয়া হয় অস্ত্র। আর ফিরে তাকাতে হয় নি তাদের। একের পর এক গেরিলা হামলা চালিয়ে ভেঙ্গে দেওয়া হয় পাকিস্থানের অস্থানা, ব্রিজ, স্থাপনা।

বর্তমান প্রেরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আমাদের এই সরকার অনেক দেখভাল করছে। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা অনেক। সেই সময় এত ছিলো না। এখনও আমার সাথের অনেক মুক্তিযোদ্ধা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিলো ওই সময় বাংলাদেশের ও ইন্ডিয়ান অনেক মানুষ আমাদের খাবার দিয়ে জায়গা দিয়ে সাহায্য করতো।

হামিদুল হক সরকার বর্তমানে রাজশাহী জেলা জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে ঢাকায় হাইকোর্টে ওকালতি করেন। ছেলে রাজশাহী জজ কোর্টে। আর ছোট মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন।

 

এসবি/এমই