বিকাল ৫:৫৯ বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯


লাভের গুড় ফড়িয়ার পেটে

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : May 18, 2019 , 7:26 pm
ক্যাটাগরি : জনদুর্ভোগ
পোস্টটি শেয়ার করুন

সাহেব-বাজার ডেস্ক : মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রংপুরের চর এলাকার মিষ্টি কুমড়া চাষিরা। পাইকারদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক সংযোগ গড়ে না ওঠার কারণে ফলন মৌসুমে কৃষকরা কুমড়ার প্রকৃত দাম পাচ্ছেন না। এ ছাড়া কুমড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকদের উৎপাদন মৌসুমে পুরো ফসল বাধ্য হয়েই কম দামেই বিক্রি করে দিতে হয়। কৃষকের সেই মিষ্টি কুমড়া মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা পানির দরে কিনে তিন থেকে চারগুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন বিভিন্ন বাজারে।

বর্ষা মৌসুম শেষে তিস্তায় চর জাগে। এরপর ৬ মাস শুষ্ক থাকে নদী। পড়ে থাকা বালু চরকে চাষ উপযোগী করতে কঠোর ঘাম ঝরায় নদীভাঙনের শিকার ভূমিহীন বাঁধে আশ্রিত মানুষ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ধু-ধু বালুচরে তারা ফলান মিষ্টি কুমড়া। খাঁ খাঁ রোদে ভারে করে পানি এনে গাছে দেন কৃষক। বীজ সংকট ও নিম্নমানের বীজের কারণে অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকরা কুমড়ার আবাদ ছাড়েননি। এ চাষের ফলে চরে কমেছে তামাকের আবাদ। কিন্তু কৃষকরা হাড়ভাঙা খাটুনির পর উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে প্রকৃত মুনাফা পান না। পাশাপাশি দেশি পদ্ধতিতে তারা বাড়িতে মাচা করে বেশিদিন কুমড়া সংরক্ষণ করতে পারেন না। উৎপাদন মৌসুমে একসঙ্গে সব কুমড়া বাজারে ওঠায় দামও পড়ে যায়। তাই সংরক্ষণাগারের অভাবে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি বাজারজাত ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠায় ফায়দা লুটছেন মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা। লাভের সিংহভাগই চলে যায় তাদের পকেটে। সরাসরি বাজারজাত করার ব্যবস্থা থাকলে কৃষকের কাছে সোনা হয়ে ধরা দিত মিষ্টি কুমড়া।

কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়ার কৃষকের দাবি, সম্মিলিতভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের আওতায় তাদের উৎপাদিত মিষ্টি কুমড়া সরাসরি বাজারজাত করতে সরকার যেন ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে মিষ্টি কুমড়ার চাহিদা থাকায় ইতিমধ্যে বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে কাউনিয়ার তালুক শাহবাজপুরের কৃষকরা কিছু মিষ্টি কুমড়া সরাসরি মালয়েশিয়ায় বিক্রি করেছেন। চীনের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল ওই চরে মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত পরিদর্শনও করেছে। গঙ্গাচড়ায় উৎপাদিত কিছু কুমড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সরাসরি সরকারের মনিটরিং থাকলে আর্থিক মুনাফায় বদলে যেত কৃষকের ভাগ্য।

গঙ্গাচড়ার মহিপুর বিজয় বাঁধের কৃষক তইয়েবার রহমান (৬৫) বলেন, ‘এই সালে কুমড়া আবাদ করেছি। ২-৩ মাসের বেশি বাড়িতে রাখতে পারি না। বাড়িতে রাখলে অনেক কুমড়ায় পচন ধরে, বাধ্য হয়ে সেগুলো গরুকে খাওয়াতে হয়। ফসল ওঠার সময় ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছ থেকে কম দামে কুমড়া কিনে অনেক বেশি দামে বাজারে বিক্রি করেন। এতে করে আমরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাই না। অথচ সরকারের সুদৃষ্টি থাকলে এই মিষ্টি কুমড়া হতে পারত আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এখানে একটা কোম্পানি তৈরি করে দিলে আমরা কুমড়ার ভালো দাম পাব। বিদেশেও রফতানি করতে পারব।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রাকটিক্যাল অ্যাকশন সূত্রে জানা যায়, কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার চরতালুক শাহবাজপুর ও গঙ্গাচড়ার মহিপুর, বিজয় বাঁধ, চরচল্লিশসাল এলাকায় ২০০৯ সাল থেকে নদীভাঙনের শিকার বাঁধে আশ্রিত কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে প্রাকটিক্যাল অ্যাকশন। এরই অংশ হিসেবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ধু-ধু বালুচরে মিষ্টি কুমড়া চাষে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীর ২২ হাজার ১৩০ জন চরের কৃষক ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ২৯ হাজার টন মিষ্টি কুমড়া উৎপাদন করেছেন। মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার মূল্য হিসাবে গড়ে ৮ টাকা কেজি দরে ১০৩ কোটি ২০ লাখ টাকার মিষ্টি কুমড়া উৎপাদন হয়েছে। ইতিমধ্যে রংপুরের এসব বালুচরে উৎপাদিত কিছু মিষ্টি কুমড়া প্রাকটিক্যাল অ্যাকশনের সহযোগিতায় নেদারল্যান্ডস, সৌদি, মধ্যপ্রাচ্য, ইয়েমেন ও সিঙ্গাপুরে রফতানি করা হয়েছে। এ ছাড়া এখানকার উৎপাদিত কুমড়া রংপুরের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের ২১টি জেলায় যাচ্ছে। 

এসবি/জেআর

সূত্র: সমকাল।