রাত ১:২১ বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯


রাজশাহীতে জঙ্গী সন্ত্রাসের মূলেই ছিলেন আতাউর রহমান

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : এপ্রিল ৫, ২০১৮ , ১১:১৮ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : রাজনীতি,রাজশাহীর সংবাদ,শীর্ষ খবর
পোস্টটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : আতাউর রহমান। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির। রাজশাহী মহানগর জামায়াতেরও আমির ছিলেন তিনি। নারী কেলেঙ্কারির কারণে তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। তবে রাজশাহীতে জামায়াতে ইসলামী যতো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়েছে তার মূলেই ছিলেন এই আতাউর। মূলত তার নির্দেশনা এবং সিদ্ধান্তেই পরিচালিত হতো রাজশাহী জামায়াত।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মারা যান জামায়াতের এই নেতা। মৃত্যুর আগে তার বিরুদ্ধে রাজশাহীর বিভিন্ন থানায় অন্তত এক ডজন মামলা ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাশকতা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দায়ের হয় মামলাগুলো। কয়েকটি মামলায় আতাউর রহমান হুকুম ও নির্দেশদাতার আসামি। পুলিশ বলছে, তার নির্দেশেই রাজশাহীতে সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড চালাতো জামায়াত।

আতাউরের নির্দেশনায় জামায়াতের বোমা তৈরীর কারখানা গড়ে উঠেছিল নগরীর বুধপাড়ার মোজম্মেলের বাড়িতে। এই বাড়িতে বোমা তৈরীর সময় বিস্ফোরন ঘটলে নিহত হন জামায়াত কর্মী আজিবার ও এক শিবির কর্মী। মোজাম্মেলের বিরদ্ধে থানায় নাশকতার একাধিক মামলা থাকলেও তিনি রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পবার দারুশায় এক জামায়াত কর্মীর বাড়িতেও বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এছাড়াও কয়েক বছর আগে নগরীর বিনোদপুরে মোহাম্মদ আলী নামের এক শ্রমিক নেতাকে হত্যা করে জামায়াত শিবির। এ সকল কর্মকান্ডের মূল হোতাই ছিলেন জামায়াত নেতা আতাউর রহমান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন ছাত্রমৈত্রীর রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সভাপতি জামিল আক্তার রতন। নগরীর বুধপাড়ায় নিহত হয়েছেন এক জাসদ কর্মী। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট ভবনে হত্যা করা হয় এক জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংষ্কৃতিক সংস্থার এক কর্মীকে। তার নাম আমান উল্লাহ। এসব হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিলেন জামায়াত নেতা আতাউর রহমান।

এর আগে ১৯৯৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রগতিশীল ছাত্রনেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রুপমকে জামায়াতের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা চলন্ত বাসের মধ্যে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিগত ১৯৯৫ সালের ১১ই ফেব্রুযারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষ সৃষ্টি হলে ১৩ই ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৭টায় রুপম তার তিন বন্ধুসহ রাজশাহী থেকে গ্রামের বাড়ি পাবনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শহর ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় পৌছালে প্রায় ১৫ জন সশস্ত্র শিবির ক্যাডার বাস টিকে থামিয়ে ভেতরে ঢুকে অর্ধ শতাধিক যাত্রীর উপস্থিতিতে চাকু ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে রুপমকে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করে।

এরও আগে, ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলায় নিহত হন রাবির ছাত্রমৈত্রী নেতা শহীদ জোবায়ের চৌধুরী রিমু। সেদিন বিটিভির রাত দশটার খবর শেষে সবাই যখন টিভি রুমে সেই সময়ের জনপ্রিয় একটি ধারাবাহিক নাটক দেখছিলেন, তখনি শেরে বাংলা হলে পরিকল্পিত হামলা চালায় শিবির। শিবির সন্ত্রাসীরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন রুমে রুমে তল্লাশি চালায় এবং ছাত্রমৈত্রীর নেতা কর্মীদের খুঁজে খুঁজে নৃশংসভাবে হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। এই পৈশাচিকতার পরও ঘাতকেরা সন্তুষ্ট হয়নি। মেঝেতে পড়ে থাকা রিমুকে কুপিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। রিমুর মৃত্যু নিশ্চিত করে তবেই ক্ষান্ত হয় নর ঘাতকেরা।

২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল দখল নিয়ে শিবিরের ক্যাডাররা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। এ সংঘর্ষে শিবিরের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ফারুক হোসেনকে খুন করে লাশ শাহমখদুম হলের পেছনের ম্যানহোলে ফেলে রাখে। একই রাতে ছাত্রলীগের আরও তিন কর্মীর হাত-পায়ের রগও কেটে দেওয়া হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহেরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিল শিবির। ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুবয়ারি রাতে অধ্যাপক ড. তাহের বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার পশ্চিম ২৩/বি বাসা থেকে নিখোঁজ হন। পরে ৩ ফেব্রুবয়ারি সকালে তার বাসার পিছনের সেফটিক ট্যাঙ্ক থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডেরর ঘটনায় ড. তাহেরের ছেলে সানজিদ আলভী নগরীর মতিহার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

২০০৭ সালের ১৮ মার্চ মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন উপ-পরিদর্শক আহসানুল কবির জামায়াতপন্থী শিক্ষক মিয়া মহিউদ্দিন ও তৎকালীন রাবি শিবিরের সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহীসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ মামলায় পুলিশ মাহবুবুল আলম সালেহীকে গ্রেপ্তার করেছিল। এরপর জামিনে তিনি মুক্ত হলে আতাউর রহমান বলেছিলেন, ‘কা’বা শরীফের গেলাফের চেয়ে সালেহী পবিত্র’।

এদিকে ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের তৎকালীন সভাপতি প্রফেসর ড. ইউনুসকে নগরীর বিনোদপুর এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি এ মামলায় দুই জিএমবি সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। অথচ এই জেএমবির সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল জামায়াত নেতা আতাউরের। রাজশাহীতে প্রগতিশীল ধারার যেসব নেতাকর্মী বর্বরতার শিকার হয়েছেন তার প্রায় সবগুলোর সঙ্গেই সংশ্লিষ্টতা ছিল জামায়াতের এই নেতার।

অভিযোগ রয়েছে, আতাউরের সঙ্গে বাংলা ভাই-সহ জেএমবির শীর্ষ নেতাদেরও সখ্যতা ছিল। নিষিদ্ধ ঘোষিত এই জঙ্গি সংগঠনটির সশস্ত্র ক্যাডাররা রাজশাহী শহরে মিছিল করলে আতাউরের নেতৃত্বে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের মোড়ে মোড়ে স্বাগত জানায়, ‘অভ্যর্থনা’ জানায়। জেএমবি সদস্যদের পানি পান করান তারা। জেএমবির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদেরকে দিয়েই জামায়াত নেতা আতাউর স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের ওপর চালিয়েছেন অত্যাচার-নিপীড়ন।

২০১৪ সারের ৫ ই জানুয়ারির নির্বাচনে রাজশাহীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পারচালিত করে জামায়াত-শিবির। জামায়াত নেতা আতাউর রহমানের নির্দেশেই তারা রাজশাহীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালিত করে।

সর্বশেষ ৬০ বছর বয়সে এসে নারী কেলেঙ্কারীতে জড়িয়ে পড়েছিলেন জামায়াতি সন্ত্রাসের নায়ক আতাউর রহমান। নারী কেলেঙ্কারীর অভিযোগে দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমিরের পদ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন তিনি। সে ঘটনায় মামলারও মুখোমুখি হন আতাউর রহমান। গত বছর তার স্ত্রী দাবি করে রশিদা বেগম (৫২) নামে এক নারী রাজশাহীর আদালতে মামলা করেন।

বাদী অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল আতাউর রহমানের সঙ্গে দুই লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর তারা গোপনে বসবাসও করেন। পরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে তিনি প্রকাশ্য হন, কিন্তু তাকে স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করেন। তিনি কাবিননামা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে দেনদরবার করলে উল্টো তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। অভিযোগে বলা হয়, একপর্যায়ে আতাউর রহমান দাবি করেন, তার সঙ্গে ঘর-সংসার করতে হলে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দিতে হবে।

জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রশিদা বেগম রাজশাহী মহানগরের লক্ষ্মীপুর শাখার ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আয়া। তার আগের পক্ষের দুই মেয়ে আছে। এক মেয়েকে নিয়ে তিনি এখন নগরের বসুয়া এলাকায় থাকতেন। রশিদা একসময় আতাউর রহমানের বাসায় কাজ করতেন। সেই সূত্রে পারিবারিকভাবে তাদের পরিচয়। বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক দিন আত্মগোপনে ছিলেন আতাউর রহমান। তখন তিনি রাজশাহী মহানগরীর আমির ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একবার আতাউর রহমান পুলিশি অভিযানে রশিদা বেগমের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন। তখন ওই বাসায় তার আত্মগোপনে থাকা নিয়ে দলে প্রশ্ন ওঠে। পরে স্থানীয় নেতাদের মধ্যেও এ নিয়ে বিতর্ক উঠলে কেন্দ্রীয়ভাবে এ ঘটনার তদন্ত হয়। ওই সূত্রের দাবি, তদন্তে আতাউর রহমানের নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর তাকে তাকে দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমিরের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে ২০১৭ সালের অক্টোবরে দলের রুকনিয়াত (সদস্যপদ) স্থগিত করার মাধ্যমে তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।

তবে তার জানাযার নামাযে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। শুধু তারাই নয়, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও এতে অংশ নেন। এ নিয়ে রাজশাহীতে চলছে সমালোচনার ঝড়। প্রগতিশীল ধারার লোকজন বলছেন, আতাউর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার করাটা ছিল লোক দেখানো একটা ‘নাটক’। কেননা জানাজায় যেভাবে নেতাকর্মীরা অংশ নেন তাতে মনে হয়নি তিনি দল থেকে বহিস্কৃত জামায়াত নেতা।

এসবি/আরআর/এসএস