রাত ১২:৩০ বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯


রাজশাহীতে আইন বাস্তবায়নে তামাকের অবৈধ বিজ্ঞাপন বন্ধে প্রদক্ষেপ জরুরি

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : আগস্ট ২৭, ২০১৯ , ৯:২৭ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

আমজাদ হোসেন শিমুল: তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী যে কোনো ধরনের তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু ইদানিং রাজশাহী মহানগরীর তামাকপণ্যের দোকানগুলোতে এই অবৈধ বিজ্ঞাপনে সয়লাব হয়ে গেছে। তবে ইচ্ছা করলেই রাজশাহী জেলা প্রশাসন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে তামাকের এসব অবৈধ বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, বেশ কয়েক মাস থেকে তামাকের অবৈধ বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখছি না। এক কারণে তামাকের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বেপরোয়াভাবে শিক্ষানগরী রাজশাহীতে তামাকের অবৈধ বিজ্ঞাপনে সয়লাব করে দিয়েছে। তাই রাজশাহীতে তামাকপণ্যের অবৈধ বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী মহানগরীর অভ্যন্তরে ২ হাজার ৭৩৬টি তামাকপণ্যের দোকান রয়েছে বলে সম্প্রতি ‘এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’র এক জরীপে উঠে এসেছে। ধূমপানে আকৃষ্ট করতে বর্তমানে এই দোকানগুলোর অধিকাংশ দোকানেই কোম্পানিগুলোর অবৈধ বিজ্ঞাপনে ভরপুর হয়ে গেছে। অথচ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, এসব বিজ্ঞাপন ও পুরস্কার-প্রনোদনা নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ৫ এর (ছ) ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে- ‘তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়স্থলে (ঢ়ড়রহঃ ড়ভ ংধষবং) যে কোন উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের প্রচার করিবেন না বা করাইবেন না।’ কেউ আইনের এ ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তার তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

তবে ইদানিং লক্ষ্য করা গেছে, প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে তামাক কোম্পানিগুলো আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তামাকের দোকানগুলোসহ পুরো নগরীতে অবৈধ বিজ্ঞাপনে সয়লাব করে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর তামাক কোম্পানিগুলো নতুন আঙ্গিকে বিজ্ঞাপন ছড়িয়েছে। ‘জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল-জেটিআই’ ও ‘ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ-বিএটিবি’- তামাকের বহুজাতিক এই কোম্পানি দুটি’র অবৈধ বিজ্ঞাপনে এখন পুরো নগরী ছেয়ে গেছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা আছে- যে কোন উপায়ে তামাকের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন নিষিদ্ধ। অথচ ‘জেটিআই’ বিজ্ঞাপন ছড়াচ্ছে- ‘শেখ’ ৪টা, ‘এলডি’ ৫টাকা, ‘নেভি’ এখন ৭ টাকা। আবার ‘ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো’ বিজ্ঞাপন ছড়াচ্ছে- ‘রয়্যালস’ ৫টাকা। বাজেট ঘোষণার পর বাজারে ‘এলডি’ ও ‘রয়্যালস’সহ বেশ কয়েকটি সিগারেটের ব্র্যান্ড নতুন এসেছে। নতুন এসব ব্র্যান্ডের সিগারেটের বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্যই তামাক কোম্পানিগুলো অভিনব উপায়ে অবৈধ বিজ্ঞাপন বাজারে ছড়াচ্ছে। নতুন করে বাজেট ঘোষণার পর সিগারেটের দাম খুব সামান্য বেড়েছে। তামাক কোম্পানিগুলোর স্ট্র্যাটিজি হলো- আগের কোনো ব্র্যান্ডের বিভিন্ন সিগারেটের দামে নতুন ব্র্যান্ড তৈরী করে সেগুলো বাজারে ছেড়ে দেয়া। এর ফলে আগের দামে নতুন ব্র্যান্ডের সিগারেট দিয়ে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করাই তাদের উদ্দেশ্য। যার কারণেই কোম্পানিগুলোর এই অবৈধ বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি।

তবে আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি- কয়েক মাস আগেও তামাকের অবৈধ বিজ্ঞাপন বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে-মধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হতো। কিন্তু বেশ কয়েক মাস থেকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে তামাক কোম্পানিগুলোর নতুন নতুন এসব অবৈধ বিজ্ঞাপন বন্ধে কোনো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে না।

এছাড়া তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে রয়েছে- বিক্রয় স্থলে তামাকপণ্যের প্যাকেট বা মোড়ক সাদৃশ্য কোন দ্রব্য, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ছাপানো কাগজ, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড বা অন্য কোনোভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা যাবে না। এছাড়া তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো উপহার, দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান আইনত দন্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনের এই ধারা অমান্যকারীকে ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রয়েছে।

রাজশাহী মহানগরীর ৩০ টি ওয়ার্ডেই তামাকপণ্যের দোকান পরিদর্শন করে আমরা দেখেছি যে, অধিকাংশ তামাকপণ্যের দোকানিকে তামাকপণ্য রাখার জন্য ‘নজরকারা’ শো-কেস উপহার দেয়া হয়েছে। আবার রাস্তার পাশে বেশ কিছু তামাকপণ্যের দোকানে উপহার দেয়া হয়েছে ছাতা। এছাড়া উপহার দেয়া হয়েছে টি-শার্ট, মগ, স্ট্রে, লাইটার ইত্যাদি। যা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের উপরের ধারা অনুযায়ী নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। বিশেষ করে তামাক বিক্রেতাদের উপহার হিসেবে দেয়া ‘নজরকারা শো-কেসে’ ভরে পুরো মহানগরী। অথচ আইনের এই ধারাটি বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগে আমাদের চোখে পড়েনি।

তামাক কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টরা এভাবে দেদারছে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করে চললেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে বতর্মানে দেশে তামাকজনিত কারণে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যুরোধ করা সম্ভব হবে না (তথ্যসূত্র: গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে-গ্যাট্স ডাটা ২০১৭)। বাস্তবায়িত হবে না ২০৪০ সালের মধ্যে ‘বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করা’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই স্বপ্ন। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে এবং প্রধানমন্ত্রীর লালিত সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তামাকের অবৈধ বিজ্ঞাপন ও পুরস্কার প্রণোদনা বন্ধে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই রাজশাহী জেলা প্রশাসন অন্ততপক্ষে জেলায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে তামাকের এই অবৈধ বিজ্ঞাপন বন্ধে জররি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক এবং সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।