সকাল ৬:০৯ বুধবার ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯


‘যাত্রা তোমার কোন্ সে দেশে’

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : August 22, 2019 , 4:13 pm
ক্যাটাগরি : আলাপচারিতা
পোস্টটি শেয়ার করুন

জিয়াউল গনি সেলিম: ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই বেপরোয়া হয়ে ওঠে তাদের দলীয় ক্যাডাররা। তাদের মাস্তানি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজিতে তটস্থ সাধারণ মানুষ। মাত্র বছরখানেকেরই মধ্যে পাড়া-মহল্লার উঠতি মাস্তানরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আস্কারা দেয় তৎকালীন প্রশাসনও।

তখন আমি সাংবাদিকতা করি স্থানীয় পত্রিকায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলা কৃষি বিভাগের ভবন (বিএস কোয়ার্টার) দখল করে কার্যালয় বানিয়েছিল এক ছাত্রদল নেতা। তখন তার দাপটের কথা সবার মুখে মুখে। ওই নেতার ভয়ে কেউই কিছু বলতেন না। সবসময় চলতো সাঙ্গপাঙ্গ নিয়েই। উপজেলা সদরের বাসস্ট্যান্ডেই বাড়ি। তাই ভাব আর ভঙ্গিমায় বুক টান করে হাঁটতো। এই নেতার সরকারি ভবন দখলবাজির নিউজটি করেছিলাম। ছবিসহ ছাপা হয়েছিল বড় করে। নিউজ প্রকাশের পর থানায় গিয়েছিলাম অন্য তথ্যের সন্ধানে। আমার উপস্থিতির খবর পেয়ে সেখানেই ছুটে যায় ছাত্রদলের ওই নেতা ও তার পোষ্যক্যাডার।

ওসির সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে আসছি। এসময় হঠাৎ থানা ভবনের মেইনগেটেই আমাকে ঘিরে ফেলে। কোনো কথা বলার আগেই চড়াও হয় তারা। কিন্তু পুলিশও তেমন কিছু বললো না ওদের। থানার ভেতরেই পুলিশের সামনে এমন ঘটনায় আমি হতভম্ব হয়ে যাই।আমার সঙ্গে থাকা সিনিয়র সাংবাদিক নূুরুল ইসলাম বাবু ভাইও চেপে যেতে বললেন। বললেন, এদের বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। ওরা স্থানীয়। তাছাড়া দল পাওয়ারে। আমাদের তো টিকে থাকতে হবে। চলো চলে যাই।

বাবু ভাইয়ের কথা শুনে নিজেকে আরো অনিরাপদ মনে হলো। খুব অসহায়ত্ব নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে আসছি। যাবো- বাসস্ট্যান্ডে বাবু ভাইয়ের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। ওইখানেই আমাদের প্রতিদিনের আড্ডা হতো। নিউজ কুরিয়ারও করতাম। বাসস্ট্যান্ড মোড়ে আসতেই দেখি জেলার টগবগে তরুণ সাংবাদিক ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট। সঙ্গে আরেক সিনিয়র সাংবাদিক সাত্তার ভাই। সেদিন কী কাজে যেন নাচোলে গিয়েছিল সুইট ভাই। তখনও তার সঙ্গে তেমন জানাশোনা হয়ে ওঠে নি। জেলার সাংবাদিক হিসেবে নামে চিনতাম। তাকে ঘটনা খুলে বললাম। সুইট ভাই বললেন-চলেন, এখুনি যাবো। আমি জানতে চাইলাম- কোথায়?

বললেন- আগে থানায় গিয়ে একটা মামলা করতে হবে। আমি রাজি হলাম না। সাত্তার ভাইও সাহস দিতে পারলেন না। বললেন- ওরা ছাত্রদলের ছেলেপেলে। বাসস্ট্যান্ড মোড়েই বাড়ি। ওদের বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। কারণ, আমাদের তো চলতে হবে। এখানেই সাংবাদিকতা করতে হবে। ওরা সবাই মাস্তান। সাত্তার ভাইয়ের কথা সত্যিই মনে হলো তখন। হতাশ হয়ে গেলাম।

কিন্তু কোনোকিছুতেই দমলেন না সুইট ভাই। তার চোখেমুখে অসীম সাহসিকতার ঝিলিক দেখে মুগ্ধ আমি। কিছু করা যাবে না মানে!! তাহলে আমরা এভাবে হামলার শিকার হতে থাকবো? মার খাবো! এটা হতে পারে না। কিছু তো করতেই হবে।এমন অসহায় অবস্থার মধ্যে তার কথাগুলো আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করলো। জেলা শহর থেকে এসেও তিনি আমাকে আমার নিজ এলাকাতেই এরকম উদ্দীপনা দিলেন। সুইট ভাইয়ের মাঝে অন্যরকম সাহস দেখে বুকে বল পেলাম আমিও। মনে হলো- সাংবাদিক তো এমনই হয়!

সুইট ভাই- আমাকে একরকম টেনেই নিয়ে গেলেন থানায়। সঙ্গে সাত্তার ও বাবু ভাই। সেখানে নিজে বসে থেকে জিডি করালেন। ফিরে গিয়ে সুইট জেলার সহকর্মী সাংবাদিকদের ঘটনাটি জানালেন। পরদিন প্রথম আলো,যুগান্তর ও ভোরের কাগজসহ বিভিন্ন দৈনিকে হামলার খবরটি এলো। এ নিয়ে তুমুল হৈচৈ হলো। সবখানে আলোচনা জমলো। কিন্তু হামলাকারীদের কিছুই হলো না। কিছু হবে- এমন আশাও করায় যায় নি অবশ্য। নীরবেই থাকলাম। তবে সাংবাদিকতা চলতে থাকলো।

এরপর ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর ওই অভিযান পরিচালিত হয়। ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ অভিযানের কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে সংসদে ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ পাস করে বিএনপি জোট সরকার। তবে সেই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১২ সালে জেড আই পান্না নামে একজন মানবাধিকার আইনজীবী হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। তার যুক্তি ছিল এ ধরনের দায়মুক্তি আইন বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। সেই রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই হাইকোর্ট ঐ দায়মুক্তি আইনকে ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অবৈধ ঘোষণা করেছেন।

অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালে গ্রেফতার হয় নাচোলের সেই ছাত্রদল নেতা। গ্রেফতার হওয়ার পর সেদিনও কেবল সুইট ভাইয়ের কথা মনে হয়েছিল। কেবলই ভেবেছিলাম- সুইট ভাই না থাকলে থানায় গিয়ে জিডি করা হতো না। হয়তো আমার সামান্য জিডির কারণে সে গ্রেফতার হয় নি। তারপরও আত্মা তৃপ্ত হয়েছিল। সেদিনও সুইট আমার কাছে নায়ক ছিলেন।

এরপর থেকে যতবার দেখা হয়েছে ততবারই প্রাণোছ্বল দেখেছি সুইট ভাইকে। কোনোদিন দেখেনি তার মন খারাপ। সবসময় মুখে হাসি লেগেই থাকতো। অফিসে অ্যাসাইনমেন্টে রাজশাহী থেকে বিভিন্ন জেলায় যেতে হয়। যতবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়েছি প্রথম ফোনটাই দিতাম সুইট ভাইকে। সেখানে গেলে আমাকে কী খাওয়াবেন, কীভাবে পেশাগত সহযোগিতা করবেন- এনিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তিনি। কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জেই নয়, রাজশাহীর সাংবাদিকদের সাথেও ছিল তার দারুণ সখ্য। সে সুবাদে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাংবাদিকদের নিয়ে দু’বার ক্রিকেটের প্রীতি ম্যাচ হয়েছে। এর উদ্যোক্তাও ছিলেন সুইট।

২০১৩ সালের এপ্রিলে দৈনিক আমার দেশ বন্ধ হওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরে জিটিভিতে যোগ দেন। কাজ করছিলেন স্থানীয় পত্রিকাতেও। কারো অজানা নয়, জেলা পর্যায়ে তেমন বেতন দিতে চায় না গণমাধ্যমগুলো। এনিয়ে সংসাবে অভাব থাকলেও কখনো হতাশা দেখিনি সুইট ভাইকে। সব সময় অসীম আশায় তার বুকের ভর করে থাকতো। বলতেন, জীবনে সৎ থাকলে সফলতা আসবেই। সে সফলতার স্পর্শ পেতে অপেক্ষা করেছেন দীর্ঘ সময়।

২০১৭ সালের শুরুর দিকের কথা। তখন আমি যুগান্তরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধির পদ খালি হলো। আমার ব্যুরো প্রধান আনু ভাইয়ের (যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার আনু মোস্তফা) কাছে সুপারিশ করেছিলাম সুইটের জন্য। রাজি হলেন তিনি। চীফ রিপোর্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ভাইসহ ঢাকা অফিসে সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত ফাইনাল করলেন। সুইট ভাই যুগান্তরে নিয়োগ পেলেন ২০১৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। ১১ মাস পর যুগান্তর ছেড়েছে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি যোগ দিয়েছিলেন কালের কণ্ঠে।

সুইটের লেখনী সব সময় ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তিনি কখনোই চাটুকারিতা করেন নি। পরিবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। বাবা মারা গেছেন কয়েক বছর আগেই। একমাত্র ছোটভাই আওয়ালীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু কখনো ক্ষমতাসীন দলের অনিয়ম ও অন্যায়কে চেপে রাখেন নি। নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন সৎপথে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কখনো উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখেন নি। তাই সাদামাটাজীবন যাপন করতেন।

গেল ১৫আগস্ট ছিল জাতীয় শোক দিবস। সকাল সাড়ে ৭টায় যমুনা টিভির চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি মনোয়ার হোসেন জুয়েলের ফোন। এতো সকালে ফোন দেখে মনে করেছিলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে (নিউজের জন্য) হয়তো কোনো বড় ঘটনা ঘটেছে। ফোন রিসিভ করতে কাঁদতে কাঁদতে জুয়েল বললেন, সুইট আর নেই! সকালে ঘুম থেকে উঠে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে…।

লেখকঃ জিয়াউল গনি সেলিম –এসএটিভি’র রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান।