রাত ২:৪০ সোমবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯


মতাদর্শ রক্ষা নাকি হারিয়ে যাওয়া!

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : নভেম্বর ২৯, ২০১৯ , ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

মুক্তার হোসেন নাহিদ : রাজনীতিতে এখন আলোচনার বিষয়বস্তু বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। এর আগের লিখেছিলাম ‘কিংবদন্তী মেনন ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের শিকার।’ এখন দেখছি কেবল কমরেড মেনন নয়, ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের শিকার ওয়ার্কার্স পার্টিও। ১০ম কংগ্রেসের আগে নিত্যদিন পত্রিকার পাতায় খবর থাকতো ওয়ার্কার্স পার্টি নিয়ে। একদিকে রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। কিন্তু সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ওয়ার্কার্স পার্টি সফলভাবে তার ১০ম কংগ্রেস সমাপ্ত করেছে। অনেকে এইভেবে গোঁফে তা দিচ্ছিলো যে, ওয়ার্কার্স পার্টি ভেঙে যাচ্ছে। ‘না’ ওয়ার্কার্স পার্টি ভাঙে নি। বরং আরো শক্তিশালী হয়েছে। পার্টির বিরুদ্ধে এখনো ষড়যন্ত্র অব্যাহত। বৃটিশবিরোধী সংগ্রাম থেকে হালের বিএনপি-জামাত ও জঙ্গিবাদ বিরোধী সংগ্রাম-ওয়ার্কার্স পার্টির একটা ধারাবাহিক সংগ্রামী ঐতিহ্য আছে। ওয়ার্কার্স পার্টি ভাঙে না, বরং ইতিহাসকে ধারণ করে ঐক্যের মোহনায় মিলিত হয়। সেই ঐক্য হয় মানুষ, রাজনীতি ও সময়ের প্রয়োজনে। ১৯৯২ সালের ঐক্য কংগ্রেসের পর পার্টি একবারও ভাঙেনি। কেবল পার্টি থেকে কিছু নেতা বেরিয়ে গেছে। তাতে পার্টি ও রাজনীতির সাময়িক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ওয়ার্কার্স পার্টি সে ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। এবারের কংগ্রেসের আগেও কিছু নেতা দল থেকে বেরিয়ে গেছেন। তবে তারাও দল ভাঙতে পারেননি। ৫৮ টি জেলার কমরেডরা ১০ম কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি সময়ের বাস্তবতায় সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর পার্টিকে মতাদর্শ বিচ্যুত হওয়ার অপবাদ দিয়ে যারা বেরিয়ে গেছেন, তারা কতটা কমিউনিস্ট মতাদর্শিক তা বিচার করবে আগামী দিনের রাজনীতি। তবে আমি দেখতে পাচ্ছি এই ষড়যন্ত্রে কেবল ওয়ার্কার্স পার্টি নয়, আগামী দিনে সমগ্র বাম রাজনীতিই বিপদে পড়বে। ষড়যন্ত্রকারীদের হঠকারি কর্মকাণ্ড তারই অশনি সঙ্কেত দিচ্ছে। সেই কঠিন পরিণতির জন্য দায়ি থাকবেন আজকের মতাদর্শ রক্ষার জন্য পার্টি থেকে বেরিয়ে যাওয়া কমরেডগণ এবং এদেশের অপরারাপর বাম বন্ধুরা। ওয়ার্কার্স পার্টি লড়ছে, লড়বে। ফিরে তাকান অতীতের দিকে।

২৭ বছর আগে শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নযাত্রায় যোগ দিয়েছিলাম। লাল পতাকা হাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম মানুষে মানুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত এই দেশ হবে ধর্মান্ধদের রাহুগ্রাস মুক্ত বাংলাদেশ। এদেশ এগিয়ে যাবে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল মুক্তচিন্তায়। সর্বোপরি রাষ্ট্রের মালিক হবে জনগণ। সেই স্বপ্নযাত্রার লড়াইয়ে এখনো আছি। এই লড়াইয়ের অগ্রভাগে থাকা নেতাদের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করি দিবালোকের মতো। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন দেখি, স্বপ্নযাত্রার কাণ্ডারিরা মতাদর্শ রক্ষা কিংবা বিকল্পের তত্ত্ব তুলে দল ভাঙে এবং বৃহত্তর কমিউনিস্ট ঐক্যের ডাক দিয়ে পরে নিজেইরা কেবল ব্র্যাকেট বন্দী হয়ে বিপ্লবের পথকে আরো ধূসর করে, তখন খুব কষ্ট লাগে। এভাবে ভাঙনের খেলা আর কতদিন। ভাঙতে ভাঙতে বেলা তো শেষ হলো, স্বপ্নযাত্রা সফল হবে কবে! মনে প্রশ্ন জাগে আসলে কি আপনারা মতাদর্শ রক্ষা চান, লাল স্বপ্নের যোদ্ধাদের কাক্সিক্ষত স্বপ্নের সমাজ চান! নাকি নিজেদের অনৈতিকতা ঢাকতে, অথবা না পাওয়ার বেদনায় কিংবা নেতৃত্বের খায়েশে ভাওতাবাজির খেলা খেলেন!

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যাপি সমাজতন্ত্র যখন বিপর্যস্ত, তখন পুঁজিবাদী শোষণের হাত থেকে মুক্তির জন্য লড়াইয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন পৃথিবীর বহু দেশের লাল স্বপ্নের কাণ্ডারিরা। সাম্রাজ্যবাদের পেটের মধ্যে থেকেও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে এখন রাষ্ট্রীয় ভবনে লাল পতাকা উড়ছে। উড়ার অপেক্ষায় আছে আরো বহু দেশ। অথচ বাংলাদেশ লাল পতাকার স্বপ্নযাত্রার পথে এগিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো অপার সম্ভাবনার পথকে আরো ক্ষীণ করছে।

আপনারা যারা মতাদর্শ রক্ষার কথা বলেছেন এবং বলছেন, তাদের জেল জীবন, আত্মগোপনে বহুকষ্টে থাকা জীবন এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করা জীবনের চেয়েও আমার বয়স অনেক কম। রাজনৈতিক বয়স তো আরো কম। মানুষের লড়াইয়ে আপনাদের যে ত্যাগ আছে তা মোটেও অস্বীকার করার নয়। তার পরেও কী কারণে, কোন ইশারায় আপনারা দল ছাড়েন, দল গড়েন তা আমার বুঝে আসে না। পার্টির রাজনৈতিক রণকৌশল, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকতেই পারে। সে ক্ষোভ আমার মধ্যেও আছে। আমি বিশ্বাস করি অধিকাংশ কমরেডদের ভিতরেও ক্ষোভ আছে। তার জন্য ফোরাম আছে, আরো উচ্চতর ফোরামে লিখিত মতামত পাঠানোর সুযোগ আছে। আছে পার্টির কংগ্রেস। তারপরেও সেই মতামত গৃহিত না হলে বুঝতে হবে আমিই ব্যর্থ। কমরেডদের বুঝাতে সক্ষম হই নাই। অপেক্ষা করতে হবে। আমার মতামত সঠিক হলে একদিন সকলেই তা গ্রহণ করবে। একেই বলে আন্তঃপার্টি সংগ্রাম। একজন কমিউনিস্টের এমনই চরিত্র হওয়া উচিৎ। কিন্তু আন্তঃপার্টি সংগ্রাম না করে, নিজের মত গৃহিত না হলে পার্টি ছেড়ে চলে যাব, পার্টিকে সুসংগঠিত না করে পার্টি ভাঙবো, সেটা কমিউিনিস্ট চরিত্র হতে পারে না। সেটা হয় হঠকারিতা। কমিউনিস্ট আন্দোলন ও কমরেডদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। সমাজ বদলের লড়াইকে পিছিয়ে দেয়া।

অনুজ বাপ্পা ও মাসুদ মাযহার ‘সাপ্তাহিক নতুন কথায়’ ধারাবাহিকভাবে একটা প্রতিবেদন তুলে ধরে ছিল। ‘মুক্তিযুদ্ধের যে গল্প আলোয় আসে নি’-নামক ধারাবাহিক ওই প্রতিবেদনে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকা সামনে আনার চেষ্টা করেছে। ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এদেশের বামপন্থীদের অনন্য ভূমিকা আছে। কিন্তু সে সময় বামপন্থীরা নানা ভাগে বিভক্ত থাকা এবং কিছু বামপন্থীদের দুই ‘কুকুরের লড়াই’-তত্ত্বের কারণে বামেরা মুক্তিযুদ্ধের ফসল ঘরে নিতে পারেন নি। অন্যদিকে বামপন্থীদের শুভাকাঙ্খি লাল মওলানা খ্যাত ভাসানী ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো-সমাজতন্ত্র কায়েম কর’ -এই তত্ত্ব দিয়ে ৭০-এর নির্বাচন থেকে দূরে সরার কারণে জাতীয়তাবাদী শক্তি মুক্তির সংগ্রামে সামনে আসে। তা না হলে ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতার প্রথম আওয়াজ তোলা মওলানা ভাসানী-ই সামনে থাকতেন। আবার ‘শ্রমিক কৃষক অস্ত্র-পূর্ব বাংলা স্বাধীন কর’- প্রথম আওয়াজ তুলেছিলেন আজকের বাম আন্দোলনের কিংবদন্তী রাশেদ খান মেননসহ আরো অনেকে। এজন্য তাদের ৭ বছর জেলও হয়েছিল। ৬৯-এর গণঅভূত্থানে জীবনদানকারী বাম আন্দোলনের সহযোদ্ধা শহীদ আসাদের আত্মদানের কারণেই তীব্র গণআন্দোলন হয়েছিল, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। কিন্তু কিছু বামপন্থীদের হঠকারিতার কারণে মুক্তিযুদ্ধের ফসল যায় জাতীয়তাবাদীদের ঘরে। স্বাধীনতার পরেও অনেক বাম নেতারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেন। দীর্ঘ সময় তারা বাংলাদেশকে মেনেই নিতে পারেন নি।

পরবর্তীতে সামরিক জিয়া ও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও বামপন্থীরা মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না হওয়ার কারণে বিজয়ের ফল খেয়েছে জাতীয়তাবাদীরা। বিএনপি-জামাতের শাসনামলে দেশজুড়ে বোমা হামলা ও মৌলবাদী জঙ্গি অপশক্তির আস্ফালন রুখে দিতে সেই সরকারকে প্রথম ‘না’ বলার সাহস দেখায় ওয়ার্কার্স পার্টি। সকল বাম ঐক্যবদ্ধ না হতে পারলেও এদেশের বামপন্থী রাজনীতির প্রথম সারির কয়েকটি দল এক হয়ে পরবর্তীতে মন্দের ভালো অসাম্প্রদায়িক শক্তি আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়। কিন্তু এবারেও নতুন তত্ত্ব দিয়ে কয়েকটি বাম দল জোট থেকে বেরিয়ে গেল। সময়ের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে গেল ওয়ার্কার্স পার্টি। সেদিন ওয়ার্কার্স পার্টি এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিল বলেই আজ রাজাকারদের গাড়িতে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত পতাকা উড়ে না। ওদের পদধূলিতে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ কলঙ্কিত হয় না। যুদ্ধাপরাধীরা আজ ফাঁসির দড়িতে। রাজনীতিতে প্রমাণ হয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি সময়ের বাস্তবতায় মার্কসবাদী দর্শন চর্চার মাধ্যমে মাঠের লড়াইয়ে সাহসী পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে পারে। সেদিন সেই লড়াইয়ে ছিল বলেই আজকের বামপন্থী বিপ্লবীরা রাজপথে এখনো লাল পতাকা হাতে দাঁড়াতে পারে। তা না হলে আজকের বাংলাদেশ হতো আফগানিস্তান অথবা পাকিস্তান। যে বাংলাদেশের মালিক হতো জঙ্গিবাদী অপশক্তি।

এবার দলত্যাগী বিজ্ঞ কমরেডদের বলছি। আপনারা মতাদর্শ রক্ষার লড়াইয়ে আছেন! আপনাদের লড়াইয়ে কতটি জেলার কতজন কমরেড আছেন জানি না। তবে যতদূর জানি যশোরের কিয়দংশ, ঝিনাইদহের দুই/একজন, ফরিপুদের এক নেতা এবং নড়াইলের কর্মী পর্যায়ের দুই/একজন ছাড়া আর কাউকে পাচ্ছেন না। এছাড়া আর যারা যাবেন, তারা বহু আগেই দল থেকে বহিষ্কৃত অথবা নিষ্ক্রিয়। এই নিয়ে আপনারা মতাদর্শ রক্ষা করবেন! অথচ আওয়াজ উঠলো ওয়ার্কার্স পার্টি ভাঙছে। ইতিহাস বলে, আপনারা হারিয়ে যাবেন। কারণ একটা অঞ্চলে থেকে এবং বয়সের ভারে ন্যূজ কমরেডদের নিয়ে , মোট কথা রাজনীতির ভিতরে রাজনীতি করে বেশি দুর এগোনো যায় না। ১৯৯৫ সালে কমরেড টিপু বিশ্বাসের নেতৃত্বে কিছু কমরেড পার্টি থেকে বেরিয়ে গেলেন। তখন মফস্বলের এক নবীন কমরেড হিসেবে জানতাম টিপু বিশ্বাস বড় মাপের নেতা। পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, বগুড়াসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ তার তেজোদীপ্ত বক্তব্যে কাঁপতো। এই বাঘা নেতা দল থেকে বেরিয়ে দল গড়লেন। এখন কমরেড টিপু বিশ্বাস ও তার দল জনবিচ্ছিন্ন। মাঝখান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হলো বাম আন্দোলন। এরপর ২০০৪ সালে পার্টি থেকে বেরিয়ে গেলেন কমরেড সাইফুল হক, কমরেড খন্দকার আলী আব্বাস, কমরেড পরেশ চন্দ্র সাহা। শুনেছি অর্থনৈতিক অনৈতিকতা ঢাকতে তাদের অনেকে দল ছেড়েছিলেন। তারাও কিছু করতে পারছেন না। কেবল প্রেসক্লাব পল্টন আর কদম ফোয়ারায় কিছু দাবির কথা বলা ছাড়া। এরপর ২০০৮ সালে পার্টি থেকে বেরিয়ে গেলেন কমরেড হায়দার আকবর খান রনো, কমরেড আজিজুর রহমান, কমরেড আব্দুস সাত্তার। তাদের অভিযোগও ছিল ওয়ার্কার্স পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে জোট করে মতাদর্শ বিচ্যুত হয়েছে। অথচ (আমার জানার ভুল না হলে) পার্টির এক বর্ধিত সভায় যখন সমগ্র পার্টি কমরেড হাতুড়ি নিয়ে নির্বাচনের পক্ষে, তখন কমরেড রনো দীর্ঘ এক বক্তব্য দিয়ে পার্টিকে নৌকায় তুলে দিলেন। এই কমরেড হায়দার আকবর খান রনোই ওয়ার্কার্স পার্টি ও সিপিবি’র ঐক্যবদ্ধ এক পার্টির অপার সম্ভাবনাকে শেষ করে দিয়েছিলেন। সেদিন বলেছিলেন সিপিবি’র সাথে রাজনীতি করা যায় না। অথচ ওয়ার্কার্স পার্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হয়ে তিনি নিজেই সিপিবিতে গেলেন। আর এবারের কংগ্রেসের আগে হঠাৎ করে বর্ষীয়ান বামনেতা আমার রাজনীতির আইকন কমরেড বিমল বিশ্বাস দল থেকে পদত্যাগের জন্য চিঠি লিখলেন। ফোরামে লিখেছেন ভালো কথা। কিন্তু ফোরামে আলোচনার আগেই তিনি তা মিডিয়ায় প্রকাশ করে দিলেন। যা তার মতো একজন বিজ্ঞ কমরেডের কাছে মোটেও আশা করা যায় না। রাজনীতিতে বিমলদার অসীম ত্যাগ আছে। তার জন্য তাকে স্যালুট করি। কিন্তু এই সময়ের কর্মকাণ্ডেরে  কারণে ভবিষ্যতে এদেশের বাম আন্দোলন ও দেশের রাজনীতি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ,তবে তার জন্যও তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

কমরেড নুরুল হাসান, কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ, কমরেড মনোজ সাহা এবং আরো দুই/একজন কমরেড ১০ম কংগ্রেসের আগে অভিযোগ আনলেন পার্টিতে কর্তৃত্ববাদী প্রক্রিয়া চলছে। পার্টি মতাদর্শচ্যুত হয়েছে। মানলাম। তার জন্য পার্টি কংগ্রেস আছে। আপনাদের বিকল্প দলিল সারাদেশে পাঠানো হয়েছিল। পার্টির সকল ফোরামে আলোচিত হয়েছে। কংগ্রেসেও আলোচনা হতো। সংখ্যাগরিষ্ঠ কমরেডরা সম্মতি দিলে সেই দলিল পাশ হতো। কিন্তু গণতান্ত্রিকতা ও আন্তঃপার্টি সংগ্রামে বিশ্বাস না করে কংগ্রেস বর্জনের ডাক দিলেন। আপনাদের এই আচরণ কী কমিউনিস্ট আচরণ! কেন সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতি ভরসা রাখতে পারলেন না? কেন কংগ্রেসের আগে পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় সভায় নীরব থেকে সব মেনে নিলেন? আজকে কমরেড বিমল বিশ্বাসও অন্যরা পার্টি ও পার্টির বর্তমান নেতৃত্বকে যে দোষ দিচ্ছেন, আপনারাও সেই দোষে দুষ্ট। আপনারাও নৌকা নিয়ে নির্বাচন করেছেন। অনেকে নৌকা নেওয়ার জন্য তোপখানা রোডে বহু সময় পার করেছেন। নৌকা পেলে কোথায় যেত আপনাদের মতাদর্শ! তাহলে কি ধরে নিব এটা মতাদর্শ রক্ষা নয়, না পাওয়ার বেদনা। আবার যে অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ আপনারা তুলেন, সেটা নাকি আপনাদের বেলায়ও প্রযোজ্য। এখন শোনা যাচ্ছে আপনাদেরও অনেকেই নাকি অনেকের অর্থ লোপাট করেছেন। অথবা পার্টির সম্পত্তি নিজের দখলে রেখেছেন। তাহলে আমরা যারা কর্মী তারা যাবো কোথায়? আমি জানি আওয়ামী লীগকে দিয়ে পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি আশা করা যায় না, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইও সম্ভব নয়। ন্যায্যতা ও সমতার সমাজ সেটাও দূরূহ ব্যাপার। কিন্তু এই মুহুর্তে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে দমাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। জামিল, রীমু, রূপম, শহীদ রাসেলসহ বহু সাথীদের আমরা হারিয়েছি। কিন্তু জামাত-শিবিরকে পরাভূত করতে পারি নাই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটা ঐক্য হয়েছে বলেই ওই অপশক্তি অনেকটা পরাস্ত। স্বাধীনতাবিরোধীরা আজ কোণঠাসা। তাই রাজনীতির এই পর্যায়ে যেসব বর্ষীয়ান কমরেডরা বিকল্পের ডাক দিয়ে মতাদর্শ রক্ষার কথা বলছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, অনেক তো সময় পার করলেন, অনেকে জীবনের শেষ বাঁকে এসেছেন। প্রকৃতির নিয়মে চলে যেতে হবে। কিন্তু যে দর্শনে আমরা বিশ্বাসী সেটার বাস্তবায়নের পথ কত দূর এগিয়েছেন? বেশিদূর না। কেবল আপনে। এছাড়া আরেকটা আপনে তৈরি করতে পারেন নি। বরং ভাঙনের খেলা খেলে বিপ্লবের পথকে আরো দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। ব্র্যাকেট বন্দী হতে হতে নিজেদের কেবল সভা সেমিনারের দল বানাচ্ছেন। তাও নিজে মাঝখানে থাকলেও দুই পাশে ব্যানার ধরে রাখার লোক পাচ্ছেন না। রাজনীতি এখানে নয় কমরেড, রাজনীতি হতে হবে ব্যাপক মানুষের জন্য। যেটা থেকে আমি আপনে, আমরা, আপনারা অনেক দূরে সরে যাচ্ছি।

এসব মতাদর্শ রক্ষা বা অন্য নামে পার্টি গড়ে পার্টির নেতা হওয়া যাবে। জনগণের নেতা হওয়া যাবে না। জনতা আপনাদের প্রতি ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছেন। অন্যদিকে অন্যান্য বামপন্থীরা ওয়ার্কার্স পার্টির এই পরিস্থিতিতে বেশ মজা নিচ্ছেন। ওয়ার্কার্স পার্টিকে বন্ধু না ভেবে শত্রুতে পরিণত করছেন। খোদ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১০ম কংগ্রেসে কেউ আসলেন না, অথচ একটা আঞ্চলিক ক্ষুদ্র পার্টির সম্মেলনে নাকি আপনারা যাচ্ছেন দল বেঁধে। তাও যশোরে। আপনারা ভুল করছেন। আপনাদের ভাষায় ওয়ার্কার্স পার্টি নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু নিশ্চই তা মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ ও দক্ষিণপন্থী অপশক্তির চেয়ে খারাপ না। আবার আপনারাও যে দোষ ওয়ার্কার্স পার্টিকে দিচ্ছেন, অনেক আগেই আপনাদের কেউ কেউ নৌকায় উঠেছিলেন। এবারও চেষ্টা কম করেন নি। পান নাই বলে আঙ্গুর ফল টক।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ওয়ার্কার্স পার্টিও এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের শিকার। এদিকে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ও দুর্নীতিবাজ লুটেরা, অন্যদিকে এদেশের তথাকথিত বামপন্থীরা, যারা অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির কথা বলছে কিন্তু পরোক্ষভাবে বিরোধীতার নামে দক্ষিণপন্থী অপশক্তিকেই সহযোগিতা করছে। ওয়ার্কার্স পার্টি এইসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সামনের লড়াইয়ে প্রস্তুত হবে। কিন্তু আপনাদের ভুলের কারণে আগামী দিনের রাজনীতিতে যে ক্ষতি হবে তা পূরণ করা দূরহ হয়ে পড়বে। মনে রাখবেন মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক কালসাপ রাজনীতিতে বিদ্যমান রেখে কখনোই প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক সমাজ কায়েম সম্ভব না। সবার আগে এই বিষ সমূলে উৎখাত করতে হবে। এখনো সময় আছে পদ-পদবী বা স্বার্থের জন্য নয়, লাল স্বপ্ন বাস্তবায়নে সময়ের বাস্তবতায় লড়াইটাকে এগিয়ে নিন। এটাই মার্কসবাদ। এটাই শ্রেণি সংগ্রাম।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা