রাত ১০:২৭ মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯


বিএনপি-জামায়াতের দখলে রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : May 27, 2019 , 9:24 pm
ক্যাটাগরি : রাজশাহীর সংবাদ,শীর্ষ খবর
পোস্টটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে ঘটেছিল ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা। হয়েছিল গোলাগুলি, আহত হয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনারও। তাই নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর তিন মাসের জন্য একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। কিন্তু এই আহ্বায়ক কমিটি ইতিমধ্যেই দুই বছর পার করেছে। তারপরেও পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ২১ সদস্যের যে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছিল সেখান থেকে আওয়ামী লীগপন্থী কোনো কোনো সদস্যকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাদের জায়গায় স্থান হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের লোকজনের। এখন মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে প্রভাব বিস্তার করে আছে বিএনপি-জামায়াতপন্থীরাই। আর তাদের দাপটে কোণঠাসা আওয়ামী লীগপন্থী শ্রমিক নেতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৪ মে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। ভোট গণনাকালে দেখা যায়, সভাপতি পদের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম প্রায় দুই হাজার ২০০ ভোট পেয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল হোসেন রবি পেয়েছেন প্রায় ৩০০ ভোট। আর সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী মাহাতাব হোসেন চৌধুরী পান প্রায় ২ হাজার ৪০০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আনিসুর রহমান পান প্রায় ৩৫০ ভোট। এ দুই পদের ভোট গণনা শেষ হলেই বহিরাগত একটি সন্ত্রাসী বাহিনী ভোটকেন্দ্রে হামলা চালায়। এ সময় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা হয়। এতে বাধা দিতে গেলে নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট অঙ্কুর সেনের মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

এতে মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ২১ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। এদিকে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে শ্রমিক নেতা মাহাতাব হোসেন চৌধুরী উচ্চ আদালতে রিট করেন। উচ্চ আদালত রাজশাহীর যুগ্ম শ্রম পরিচালককে ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে শ্রম পরিচালক একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেন এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। শ্রমিক নেতারা আবার নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেন। কিন্তু এরই মধ্যে জেলা যুগ্ম জজ প্রথম আদালতে একটি মামলা হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত করা হয়। কিন্তু এই নির্বাচন আর হয়নি।

ফলে প্রায় দুই বছর ধরেই মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কামাল হোসেন রবি। আর যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন মোমিনুল ইসলাম মোমিন। তাদের ২১ সদস্যের ওই কমিটি থেকে সংগঠনের গঠনতন্ত্র ভেঙে কমল ঘোষ বসাক ও মেরাজুল ইসলাম নামের দুই শ্রমিক নেতাকে বাদ দেয়া হয়েছে। এরা দুজন আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক এবং নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। এদের স্থানে অন্য দুজনকে ঢোকানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্রমিক ইউনিয়নের বর্তমান আহ্বায়ক কামাল হোসেন রবি ও যুগ্ম আহ্বায়ক এখন আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে নিজেদের দাবি করলেও বিএনপি সরকারের আমলে তারা বিএনপিকেই সমর্থন করতেন। রবি বিএনপি সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী কবির হোসেনের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। আর মোমিনের ভাই এখনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে এখন যারা আছেন তাদের মধ্যে ভুট্টু, মোরগ টুটুল, উজ্জ্বল, রহমান, দিলিপ, নজরুল, রজব, হাকিম, টুলু, পল্টু, পিন্টু, আদিল, আলমগীর, আলী, পারভেজ ও টাক টুটুল বিএনপির সমর্থক। এছাড়া জামায়াতের সমর্থক সেলিম হোসেন। এদের মধ্যে রজব বিএনপির প্রভাবশালী নেতা নাদিম মোস্তফার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে এখন আওয়ামী লীগের সমর্থক হাতেগোনা কয়েকজন। তারা হলেন, আনন্দ, আবুল কালাম আজাদ, মামুন ও হবি।

আওয়ামী লীগপন্থী শ্রমিক নেতারা বলছেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপি-জামায়াতপন্থী লোকজন রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকায় তারা সরকারি নানা অনুদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দুর্ঘটনায় পড়ে শ্রমিকরা হতাহত হলেও তারা সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করতে পারেন না। তাই তারা দ্রুত নির্বাচন দাবি করছেন।

মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নগর আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মাহাতাব হোসেন চৌধুরী বলেন, ২০১৭ সালের নির্বাচনে সভাপতি পদে রফিকুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক পদে আমি নির্বাচিত হই। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর পরাজিত প্রার্থীরা ২৬ লাখ টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে ব্যালট ছিনতাই করান। ফলে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। তারপর তিন মাসের জন্য একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন হলেও দুই বছরেও নির্বাচন হয়নি।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলর বলেন, শ্রমিক ইউনিয়ন এখন বিএনপি-জামায়াতপন্থী লোকজন দখলে রেখেছেন। তারা সংগঠনের তহবিলের নামে সড়ক থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তুলছেন। কিন্তু তহবিলে কোনো টাকা নেই। সব টাকা লুটপাট হচ্ছে। কেউ প্রমাণ চাইলে দিতে পারব। এখন দুর্ঘটনায় পড়লে শ্রমিকরা বিনা চিকিৎসায় মরছেন। এ অবস্থা চলতে পারে না। তাই সাধারণ শ্রমিকদের স্বার্থে দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

তিন মাসের কমিটি নিয়ে দুই বছর পার করার বিষয়ে জানতে চাইলে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক কামাল হোসেন রবি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে কথা বলতে বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ নাসির উদ্দিনের মুঠোফোনে ফোন করা হয়। কিন্তু ফোন না ধরার কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাজিয়া সুলতানা বলেছেন, তিনি ছুটিতে আছেন। নথিপত্র না দেখে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।

এসবি/আরআর/এআইআর