সকাল ৯:৩৩ বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯


বাংলাদেশে দুর্নীতি কি কমবে?

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯ , ৮:০১ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

মামুন রশীদ : ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইদানীংকালে চীনে এবং বেশ কয়েক বছর আগে পেশাগত সম্পৃক্ততার কারণে আফ্রিকাতে দেখেছি বেশির ভাগ জনবিচ্ছিন্ন সরকার ‘কিছু লোককে পাইয়ে দেওয়ার অর্থনীতিতে’ বিশ্বাস করে বলেই বেশ কিছু ‘ইন্টারেস্ট গ্রুপ’ তৈরি করে এবং এদের মূল লক্ষ্য থাকে টাকাপয়সার লেনদেন। এসব সরকার প্রচুর অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করতে চায়। অবকাঠামোগত বিনিয়োগ মানে প্রত্যক্ষভাবে বেসরকারি খাত ও অর্থনীতিকে সহায়তা করা আর পরোক্ষভাবে বড় কন্ট্রাক্ট মানেই হচ্ছে বড় ঘুষের লেনদেন।

বিকাশমান দেশগুলোতে সরকারগুলোর দায়বদ্ধতা ক্রমাগতভাবে কমছে। তবে দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি কমা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন সরকারে থাকতে পারছে, কারণ তারা স্বাভাবিকভাবে সন্ধি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে। আরেকটি গ্রুপ রয়েছে, যারা মনেই করে যে তাদের ক্ষমতার উৎস হচ্ছে সরকার-সংশ্লিষ্টতা বা নৈকট্য। তারা মনে করে, আমরা সরকারে রয়েছি, বেসরকারি খাতে যাইনি, উদ্যোক্তা হইনি, সরকারকে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। সরকারের পদবি, সরকারের নৈকট্য ব্যবহার করে আমাদের টাকা বানাতে হবে। এ ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই।

আমরা মনে করেছিলাম সরকারে মেধাবী লোকদের যোগদানে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা অবশ্যই বাড়ানো উচিত। বর্তমান সরকার প্রায় তিন গুণ বেতন-ভাতা বাড়িয়েছে। কিন্তু এরপরও কোনো দুর্নীতি কমেছে, এমনটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমেই দুর্নীতি দূর করা সম্ভব, যেটি এখন বিশ্ব স্বীকৃত পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহারও কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মূল মূল জায়গায় হতে দেওয়া হচ্ছে না। ভূমি নিবন্ধনে, আইন মন্ত্রণালয়ে, আদালতগুলোর কেস ডিসপোজাল ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক যুগে রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে বলে আমরা শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবায়ন কথা অনুযায়ী হচ্ছে না। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন, এ ছাড়া আরও বেশ কিছু প্রকল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বেশ খানিকটা এগিয়েছে। তারপরও দুর্নীতি খুব একটা কমছে না।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পরম্পরায় ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যদি কোনো একটি প্রকল্পে বরাদ্দ থাকে ১ হাজার কোটি টাকা, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সে বরাদ্দ বেড়ে হয়ে গেছে অনেক অনেক গুণ। আমরা পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যয় বরাদ্দেও এটা দেখছি। এগুলোতে প্রাক্কলিত ব্যয় কত ছিল, আর এখন কত টাকা শুনতে পাচ্ছি।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। এ জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রচুর টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। সরকারগুলো এসব যথেচ্ছাচারী প্রকল্প পরিচালক, যাঁরা নাকি দুর্বিনীত প্রকল্প পরিচালক, দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আরেকটি হচ্ছে ‘পাইয়ে দেওয়ার অর্থনীতি’। আমাদের যদি ক্ষমতায় থাকতে হয় কিংবা আমাদের যদি ক্ষমতায় আসতে হয়, তাহলে যেসব প্রেশার গ্রুপ রয়েছে, তাদের যদি খুশি না রাখতে পারি, তাহলে আমাদের অসুবিধা হবে। এ ক্ষেত্রে সুবিধা রয়েছে, আবার অসুবিধাও রয়েছে। বড় বড় প্রকল্প মানে বড় বড় দেশ এখন এগিয়ে আসছে। ভারতীয় বা চীনা কোম্পানি যদি ঠিকাদার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, তাহলে একটি জার্মান বা ব্রিটিশ কিংবা মার্কিন কোম্পানি কেন নয়। যার ফলে, যে বড় দেশগুলো আগে আমাদের ওপর গণতন্ত্র সুসংহত করার জন্য, জনগণের অধিকারকে সমন্বিতকরণে কিংবা মানবাধিকারকে সুসংহত করার জন্য চাপ দিত, তারা এখন যখন দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তখন এদের বেশি দৃষ্টি চলে গেছে নিজ দেশের কোম্পানিকে ব্যবসা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে। এর ফলে সাধারণভাবে আমাদের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মানবাধিকার, রাজনৈতিক সুব্যবহার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ক্রমাগত দুর্নীতির ফলে কী হয়? মানুষ হেরে যায়। সাধারণ মানুষ মনে করে আমার আত্মীয় যদি প্রকল্প পরিচালক না হয়, তাহলে আমার ছেলে চাকরি পাবে না। আমি যদি একটি ব্যবসায়ী গ্রুপকে সুবিধা না দিতে পারি, আমার ছেলেমেয়ে চাকরি পাবে না। যার ফলে সত্যিকার অর্থে সরকার যেটি চায় মেধা লালন, মেধাকে আকর্ষণ করা, সেটি কিন্তু হচ্ছে না। এমনকি গরিব ছেলেটাও মনে করবে আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দেব এ কারণে নয় যে আমি জনসেবা করব, কারণ আমার কোনো উপায় নেই, আমার প্রচুর টাকা প্রয়োজন রয়েছে। এ টাকা কিন্তু ‘আন-আর্নড মানি’। দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা ‘আন-আর্নড মানি’। এটি বৃহত্তর মানি লন্ডারিংয়ের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। যেকোনো ‘আন-আর্নড মানি’ যেটা আমি ডিজার্ভ করি না, সেটা একটা সমস্যা।

আরেকটি সমস্যা হলো, সরকারকে ব্যবহার করে, রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে কোনো ধরনের অর্থপ্রাপ্তি, যা প্রকৃতপক্ষে গরিবের ক্ষতি করে। গরিব বঞ্চনার শিকার হয়। আমাদের মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্র ও সরকার হচ্ছে গরিব মানুষের ত্রাণকর্তা। সাধারণ মানুষ যখন মনে করে এটা আমার সরকার নয়, প্রচুর বড় বড় প্রকল্প করার পরও যখন তারা মনে করে আমার কী লাভ, আমার ছেলে তো চাকরি পাচ্ছে না, আমি তো তিন বেলা খেতে পাচ্ছি না, তখন বিচ্ছিন্নতাবাদ-হতাশাবাদ তৈরি হয়। হতাশা ও ন্যায়সংগত অপ্রাপ্তি ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেয়।

যেকোনো সরকারের জন্য বিরাট একটি কাজ হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের স্বাধীনতার পর সরকারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে, টেকসইভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। দুর্নীতি রোধ করার জন্য যে ধরনের সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নেওয়া দরকার, তা দেখা যায়নি। বরং উন্নয়ন-সহযোগী বা বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে ‘হি অর শি হ্যাজ ফ্যান্টাস্টিক টলারেন্স ফর করাপশন’ বা দুর্নীতির ব্যাপারে তার রয়েছে অসীম সহ্যক্ষমতা।

আমাদের একদিকে যেমন নৈতিকতার স্খলন ঘটেছে, সত্যিকার ধর্মীয় বোধেরও স্খলন ঘটেছে, সামাজিক মূল্যবোধের স্খলন ঘটেছে। এটি হয়েছে দুর্নীতি ও দুষ্ট পুঁজির মধ্যে ব্যাপক ‘সখ্য’ হয়ে যাওয়াতে। সরকার, রাষ্ট্র ও দুর্বিনীত পুঁজির ‘অনৈতিক সখ্য’ ঘটেছে। এ ‘অনৈতিক সখ্য’ কোনো দিনও গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে পারে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে না।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

এসবি/জেআর