সকাল ৬:২২ বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর, ২০১৯


ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব তুলে বারবার সাম্প্রদায়িক হামলা, কৌশল একই

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : October 21, 2019 , 5:51 pm
ক্যাটাগরি : জাতীয়,শীর্ষ খবর
পোস্টটি শেয়ার করুন

সাহেব-বাজার ডেস্ক : বাংলাদেশে গত আট বছরে কয়েকটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রায় একই ধরণের কৌশল ব্যবহার করে এসব হামলার পটভূমি তৈরি করা হয়েছে।

এর মধ্যে এবারই প্রথম পুলিশ শুরুতেই জানিয়েছে, তারা এটি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে যে ভোলার বোরহানউদ্দিনে একজন হিন্দু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের নবী মোহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও এটি করেছেন দুজন মুসলিম।

ওই হিন্দু ব্যক্তি আগেই তার আইডি হ্যাকের কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন।

পুলিশ বলছে যে দুই মুসলিম ব্যক্তি একজন হিন্দু ব্যক্তির ফেসবুক হ্যাক করে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছিলেন তাদের আটক করা হয়েছে।

তবে হিন্দু বা বৌদ্ধদের ওপর এ ধরণের ভুয়া খবর প্রচার করে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়।

২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও বৌদ্ধবিহারে হামলার ঘটনা পুরো দেশকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিলো।

তখনও ফেসবুকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজনের নামকে যুক্ত করে দেয়া হয়েছিলো।

এবার সর্বশেষ ভোলাতেও সেই একই কৌশল দেখা গেছে। তবে এবার পুলিশ শুরুতেই জড়িত দুজনকে আটক করেছে।

বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামে একজনের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ঐ বার্তাটি বিভিন্নজনকে পাঠানো হয় বলে জানাচ্ছে পুলিশ।

কিন্তু এরই মধ্যে এর জের ধরে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চার জন এবং ইসলামপন্থীরা ফাঁসি দাবি করছে মি. বৈদ্যের।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনার জন্য যে দুজন দায়ী তাদের আটক করা হয়েছে তারাই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ম্যাসেঞ্জারে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছে যেগুলো পরে স্ক্রিনশট নিয়ে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের বলে প্রচার করে।

মিস্টার বৈদ্য এর আগে থানায় উপস্থিত হয়ে তার আইডি হ্যাক করার কথা জানান ও তিনি এখনো পুলিশ হেফাজতেই আছেন।

এরপর তৌহিদী জনতার ব্যানার নিয়ে মাঠে নামে একদল ব্যক্তি ও যা পরে রূপ নেয় সংঘর্ষে।

ফেসবুক ব্যবহার করে ধর্ম বা নবী অবমাননার অভিযোগ তুলে একই কৌশলে হিন্দু বা বৌদ্ধদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে আগেও।

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ পল্লির হামলা

সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজার জেলার রামুতে ২০১২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি ছবি ট্যাগ করার ঘটনা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়।

উত্তম বড়ুয়া নামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক যুবকের ফেসবুকে কোরান অবমাননার ছবি কেউ ট্যাগ করে দেয়। এর জের ধরে রামুতে বৌদ্ধ স্থাপনা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘরে হামলা করা হয়। দশটিরও বেশি বৌদ্ধ বিহার ও প্রায় ২৫টি বাড়িতে হামলা হয়েছিলো।

এর আগে প্রচার করা হয়েছিলো যে একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে উত্তম বড়ুয়া নামে এক বৌদ্ধ তরুণের ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম ধর্ম, কোরান বা নবীকে অবমাননা করা হয়েছে।

কিন্তু যেই তরুণের নাম প্রচার করা হয়েছে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি আর এবং এসব ঘটনায় কারও তেমন কোনো শাস্তির খবরও পাওয়া যায়নি।

ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার নাসিরনগরে আক্রান্ত হিন্দুরা

২০১৬ সালের ৩০শে অক্টোবর।

রামুর কায়দাতেই হামলাটি হয়, তবে এখানে আক্রান্ত হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। অভিযোগও সেই পুরনো—ফেসবুকে ইসলাম বিদ্বেষী ছবি।

এজন্য প্রচার করা হয় রসরাজ নামে এক হিন্দু ব্যক্তির নাম।

অভিযোগ তোলা হয়েছিলো যে মুসলমানদের কাবা ঘরের সঙ্গে হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি ছবি জুড়ে দিয়েছিলেন রসরাজ।

এ ঘটনার জের ধরে তাকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা।

তবে ঘটনা তাতে থেমে যায়নি।

পরে ইসলামপন্থী কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে ও সেখান থেকেই হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা শুরু হয়।

প্রায় তিনশো বাড়ি ভাংচুর করা হয়।

অথচ আড়াই মাস পর জেল থেকে বের হয়ে রসরাজ জানান তিনি ফেসবুক চালাতে পারেননা। এমনকি এর যে পাসওয়ার্ড বলে একটি বিষয় আছে তা নিয়ে তার কোনা ধারণাই নেই।

রংপুরেও নাসিরনগর মডেল

নাসিরনগরে হামলার এক বছর পর ২০১৭ সালের ১০ই নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়াতে ফেসবুক থেকে ছড়ানো গুজবের জের ধরে এক জনের মৃত্যু হয়।

অভিযোগ সেই একই—হিন্দু তরুণের ফেসবুকে থেকে নবীকে অবমাননার অভিযোগ।

পুলিশ তখন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, টিটু রায় নামে যে ব্যক্তির ফেসবুক পোষ্ট ঘিরে এই ঘটনা সেই টিটু রায়ের বাড়ি গঙ্গাচড়ায় হলেও তিনি নারায়ণগঞ্জে বসবাস করেন।

গঙ্গাচড়ায় কয়েকদিন মাইকিং করে হামলা হয়েছিলো হিন্দুদের বাড়িঘরে।

পর টিটু রায়কে গ্রেফতারও করা হয়েছিলো।

সিলেটের ওসমানীনগরেও সেই ফেসবুক স্ট্যাটাস

চলতি বছরের জুনে ইদের নামাজের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে সিলেটের ওসমানীনগরে।

সনাতন ধর্মের এক নারীর মৃত্যুর পর সৎকার নিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের কয়েক ব্যক্তির মধ্যে মত বিরোধ হয়।

পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির নামে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে এমন কিছু পোস্ট দেয়া হয় যা নিয়ে মুসলিমদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করে। এর জের ধরে কয়েকটি বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।

এসবি/জেআর