রাত ১০:২৬ বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯


প্রিয় তুবা, বাকরুদ্ধ কন্যা

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : July 25, 2019 , 2:56 pm
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

তাসনিম তুবা। মাগো, মা আমাদের, তুমি আজ সর্বহারা। পৃথিবীতে মা নেই যার, কপাল পোড়া তার- এই প্রবাদবাক্যটি বাঙালি জনসমাজে বহুল প্রচলিত। তোমার এত কিৃছু জানার বয়স হয়নি রে মা। তোমার জীবনে মর্মন্তুদ, নিষ্ঠুরতা, পৈশাচিক উন্মত্ততার যে গাঢ় ছাপ বেদনাকাতর উপাখ্যানের জন্ম দিল- এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের ভার বহন করা দুরূহ। মা, তোমার জানার বয়স হয়নি; তবু এখন তোমাকে ধাপে ধাপে এই আল্লাদিনী বয়সেও অনেক কিছুই জেনে নেওয়ার পাঠ নিতে হবে। আমাদের রক্তস্নাত এই স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ডে ‘চিলে কান নিয়ে গেছে’- এমন গুজবের পেছনে দৌড়ানোর বহু নজির আছে। এই নজির অনেক ক্ষেত্রেই বড় বেশি নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, পৈশাচিক উল্লাসের উপাখ্যানও হয়ে আছে।

মামণি তুবা, তুমি মাত্র চারের কোঠা পেরোতে না পেরোতেই এই সমাজ বাস্তবতার যে ক্ষতের সঙ্গে পরিচিত হলে, জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ মাকে হারিয়ে এর দুর্বিষহ যন্ত্রণার স্পর্শে এই জনপদের অনেকেই বেদনার্ত। বৈরিতার মধ্যে প্রজন্মের বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে তোমার সামনে কি আতঙ্ক জাগানিয়া এই বার্তা দাঁড়ায়- সাবধান, তুমি ওদিকে পা দিও না। এ জনপদের আঁকেবাঁকে বড় বেশি পিচ্ছিলতা। হয়তো তুমি আঁচ করতে পারনি; কিন্তু এমনটিই বড় বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা। তুমি হয়তো জান না (বলা ভালো অনুধাবন করার মতো বয়স তোমাকে সেই অনুমতি দেয়নি), তোমার মতো কত তুবা এই সবুজ শ্যামলিমায় কতভাবেই না বিপন্ন-বিপর্যস্ততার ছোবলে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। অভিভাবক হিসেবে আমরা অনেকেই বড় বেশি অসহায়বোধ করি এখন পদে পদে এই রক্তস্নাত জনপদে।

মামণি তুবা, আমরা ছোটবেলায় কতবার শুনেছি- আলোর পথের যাত্রী শব্দবন্ধটি। ত্রিশব্দের এই শব্দবন্ধ শুনতে শুনতে আমরা যখন বড় হয়ে ওঠার পথে পা রেখেছি, তখন থেকেই যেন সমান্তরালে ভেসে উঠেছে এর বিপরীতে একটি বাক্য- আমরা আঁধার পথের যাত্রী। বড় বেশি অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অস্বস্তিকর বিপদসংকেত। কিন্তু বাস্তবতার সে পথেই আমাদের নিয়ে যেতে শুরু করল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সেই শিশু শেখ রাসেলের আর্তনাদ শোনেনি পাষণ্ডরা, যেমনটি শোনেনি তোমার আর্তনাদ। তোমার মমতাময়ী মা প্রকাশ্য দিবালোকে আমাদের এই ঢাকা মহানগরী, যাকে তিলোত্তমা হিসেবে গড়ে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টার অন্ত নেই, সেখানে একদল মানুষরূপী দানবের তার ওপর আছড়ে পড়ায় চিরবিদায় নিতে হলো। ওরা তো জানে না তুমি কী হারালে। তোমার মতো কত তুবাই তো কত না ভাবে নাম লিখিয়েছে সর্বহারার কাতারে।

মামণি তুবা, এখানে আইন অমান্যের সড়কটিকে স্বেচ্ছাচারীরা কবেই না মহাসড়কে রূপ দিয়েছে। এখানে এখন যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা, বিপদাশঙ্কা আমাদের যেভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে, তারপর আর মনুষ্যজীবন বলে কিছু থাকে না। এখানে সায়মারা পাশবিকতার বলি হয়। উদ্বেগ ও বিস্ময়ের হলো, সায়মাদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। আমাদের সন্তানদের এমন বিপন্নতা-বিপর্যস্ততায়ও সমাজদেহ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে এটুকু বার্তা পাচ্ছে না- না, এমন দানবীয় উল্লাস-কামনা-বাসনা পূরণের জন্য এই জনপদকে অভয়ারণ্য হতে দেব না। যদি তাই হতো তাহলে সায়মাদের বীভৎসতার শিকার হওয়াটা আমাদের গা সওয়া হয়ে যেত না। এই যে এত কিছু হ্যাঁ কিংবা না-এর প্রত্যয়, তাতে কিন্তু এখানে যুক্ত-বিযুক্তের কোনো বিভেদরেখা তৈরি করে না!

মামণি তুবা, সায়মাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে কতদিন সকাল থেকে দুপুর হয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, বলতে পারব না। ছয় বছরের সন্তান সহিষুষ্ণ যখন পত্রিকার পৃষ্ঠায় আঙুল রেখে প্রশ্ন করে, বাবা, ধর্ষণ কী- তখন নির্বাক হয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। সে তার সঙ্গী আবিদাকে যখন প্রশ্ন করে- দিদি পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলে কান্না আসে কেন? মামণি তুবা, তখন স্পষ্ট বুঝতে পারি নিষ্ঠুরতার প্রকট ছায়া এখন এই বয়সকেও স্পর্শ করছে সাংঘাতিকভাবে। মামণি, আজ যখন সমকালের প্রথম পৃষ্ঠায় তোমার ছবির ওপর আঙুল রেখে চোখ বুলিয়ে সন্তান প্রশ্ন করল- বাবা, তুবা কাঁদছে কেন? টেলিভিশনে দেখেছি তুবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে অনেকের সঙ্গে; কেন বাবা, কেন? মা রে, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারি না।

মামণি তুবা, গুজবের কোনো হাত-পা নেই। গুজবের কোনো অবয়ব নেই। গুজবের গতি যেন আলোর গতির চেয়েও দ্রুততর। একাত্তরে সবরকম অন্যায়-অত্যাচার-শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের যবনিকাপাত ঘটিয়ে জন্ম নেওয়া এই রক্তভেজা বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় তো এরই দৃষ্টান্ত রয়েছে স্তরে স্তরে। আমরা সমাজবিজ্ঞান-মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞাসূত্র খুঁজি মামণি। এর ওপর ভর করে তোমার কিংবা সায়মাদের মর্মন্তুদতার সমীকরণ করি। খুঁজি ফ্রয়েডীয় তত্ত্বসহ কত কিছুই না। যে জনসমাজে আজ তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাতৃহত্যার প্রতিবাদে ফের চোখের জলে সিক্ত হলে, সেই সমাজ কতটা দৃঢ়তায় অন্যায়-অবিচার-স্বেচ্ছাচার-অনিয়ম রুখে দিতে সক্ষমতা দেখাতে পারছে- এসব প্রশ্নের উত্তর তর্কাতীত নয়। তবে এও সত্য মামণি তুবা, এই সমাজের অর্জনও কম নয়।

মামণি তুবা, আমরা যে নিজেদের নিরীহ-শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে পরিচয় দিতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, এর যথার্থতা আজ কত বেশি প্রশ্নবিদ্ধ! এরই তো বেদনাকাতর সাক্ষী হয়ে গেলে তুমি। মানুষের নির্মমতার যে পরিচয়ের সঙ্গে তোমার জীবনের শুরুতেই সাক্ষাৎ ঘটল সমান্তরালে, তোমার ১১ বছরের সহোদর তাহসিন আল মাহিনের, এর কোনো সান্ত্বনা-ভাষা নেই। পত্রিকার পাতাজুড়ে, টেলিভিশনের পর্দাজুড়ে তোমার আকুতি-অভিমান বড্ড বেশি ফুটে উঠেছে। মাগো, মা আমার, মাহিন হয়তো বুঝতে পেরেছে তোমাদের মা আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তুমি তো এখনও অভিমান করে বসে থাকো, মা না এলে ভাত খাবে না। মামণি তুবা, মা আর ফিরবেন না- এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে তোমাকে এগোতে হবে, বাঁচতে হবে, মানুষের মতো মানুষ হয়ে পথে পথে আলো ছড়াতে হবে। জ্ঞানীরা বলেন, বাঁচার অধিকার না থাকলে মানবজনমই বৃথা। কিন্তু তুবা, এই সমাজ তোমাদের, আমাদের নির্বিঘ্নে বাঁচার জন্য কতটা উপযোগী? আয়ুস্কাল ফুরিয়ে যায় ঘাত-প্রতিঘাতে বড় বেশি মর্মন্তুদতার চাদরে আবৃত্ত হয়ে। যে হিংস্রতা, কূপমণ্ডূকতা, বিকারগ্রস্ততার শিকার হয়ে তোমাদের জন্মদাত্রী হারিয়ে গেলেন চিরতরে; সমাজে তোমার মাতৃঘাতকদের ঘাপটি মেরে থাকার এই ক্ষেত্রও কিন্তু কম বিস্তৃত নয়। নানা রকম অন্যায়-অনাচার-অস্থিরতার প্রেক্ষাপট এখানে ক্ষণে ক্ষণে সৃষ্টি হয়, আবার কখনও কখনও এর স্থায়িত্বও হয় দীর্ঘ। এই যে গত কিছুদিন ধরে গণপিটুনির মতো নিষ্ঠুরতার প্রকট রূপ আমরা দেখছি, এই অপসংস্কৃতিও কিন্তু এ সমাজে নতুন নয়।

মামণি তুবা, আমরা প্রণিধানযোগ্য অনেক কিছুই আলোচনা করে অহরহ ঝড় তুলি। আমরা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার মতো ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছি তাও অনেককাল ধরেই। মনস্তত্ত্বের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি দূর করে যুক্তিগ্রাহ্য মনস্তত্ত্ব তৈরির তাগিদও দিচ্ছি। কিন্তু তারপরও ভয়াবহ অপসংস্কৃতি থেকে সমাজ মুক্ত হতে পারছে না। এই যে গুজব তা কি নিছকই গুজব? এর পেছনে কি সামাজিক-রাজনৈতিক ভিন্ন বিকারও অগোচরে যুক্ত নয়? এমন অনেক প্রশ্নই দাঁড়াচ্ছে, দাঁড়াবেও। কিন্তু তোমার কিংবা মাহিনের যে শূন্যতা জীবনকে বিপন্ন-বিপর্যস্ততার চাদরে ঢেকে দিল, এর কি যথাযথ প্রতিকার হবে? যে কোনো সময় যে কোনো কেউ তুবা কিংবা মাহিন বা সায়মা হয়ে যেতে পারে। যে কোনো সময় যে কোনো কেউ তাসলিমা বেগম রেনুও হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই হয়ে যাওয়াই কি আমাদের নিয়তি?

মামণি তুবা, না, এমনটি আর যেন হতে না পারে এ জন্য তোমাকে সামনে নিয়ে সমাজ দাঁড়িয়েছে দৃঢ় প্রত্যয়ে। আমরা এখন দেখতে চাই, এই প্রত্যয় আইনের শাসনের পথ কতটা দ্রুততায় নিস্কণ্টক করতে পারে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরির প্রতিবন্ধকতার দেয়াল কতটা ক্ষিপ্রতায় গুঁড়িয়ে দিতে পারে। আমরা নৈরাজ্যের লীলাভূমি হতে দেব না এই জনপদকে। সেই কবে কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তার ‘অন্নদার ভবানন্দ ভবনে যাত্রা’ কবিতায় বলে গেছেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। কবির এই প্রার্থনা চিরন্তন সত্য। স্নেহ-মমত্ব-ভালোবাসা মিশ্রিত এই যে আকুলতা, এই আকুলতার ব্যাপ্তিময়তা ও পূর্ণতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সব সম্ভাবনা।

মামণি তুবা, আমরা বলতে চাই না, বিচার পাই না, তাই বিচার চাই না। আমরা প্রশ্ন করতে চাই না- কেন আমার সন্তান দুধেভাতে থাকে না। আমরা বলতে চাই না, ভয়ের অপসংস্কৃতি আমাদের বালুতে মুখ গুঁজতে বাধ্য করছে। আমরা এও পুনর্বার মনে করিয়ে দিতে চাই না- নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পাবে না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, বিশ্বাস রাখতে চাই- কেউই আইনের ঊর্ধ্বে না। সবকিছু মেনে নেওয়াই আমাদের নিয়তি হতে পারে না।

 

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষুষ্ণ, সাংবাদিক।