বিকাল ৫:০২ মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯


নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : November 20, 2019 , 10:24 pm
ক্যাটাগরি : রাজশাহীর সংবাদ,শীর্ষ খবর
পোস্টটি শেয়ার করুন

সাখাওয়াত হোসেন : দেশের প্রাচীনতম সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে পরিচালিত এই সংগ্রহশালাটি জ্ঞান পিপাসুদের কাছে পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভাষ্কর্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ এ সংরক্ষণাগারটি রয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। মহামুল্যবান প্রত্ন সামগ্রির এই ভান্ডারটির নিরাপত্তায় নেই বাড়তি কোন ব্যবস্থা। নিরস্ত্র কয়েকজন আনসার সদস্য এখানে পাহারায় থাকেন মাত্র। দেশের সরকারী বেসরকারি স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরার ব্যবহার ব্যাপকভাবে চালু হলেও জাদুঘরটিতে লাগানো হয়নি সিসি ক্যামেরা।

১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বরেন্দ্র জাদুঘর। এরপর থেকে এই জাদুঘরে জায়গা পায় ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী নানা প্রত্নতত্ব সামগ্রী। দীর্ঘ সময়ে নানান রাজনৈতিক পট পরিবর্তন আর বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পার করতে হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে।

ঐতিহ্যের ধারক এই জাদুঘরটি ১৯৬৪ সালে হস্তান্তর করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। তখন থেকেই বরেন্দ্র জাদুঘরটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে। বরেন্দ্র জাদুঘরটিতে থাকা দুস্প্রাপ্য সব প্রত্নসামগ্রী ও মোঘল আমলের কয়েকশ মুদ্রা নজর কাড়ে দেশি-বিদেশী দর্শনার্থীর। কিন্ত এসবের সংরক্ষণ নিয়ে বরাবরই গা ছাড়া ভাব দেখা গেছে। এখানে কতগুলো প্রত্নসামগ্রী আছে, সেগুলোর কী অবস্থা এ নিয়ে তেমন একটা নজরই ছিলোনা সংশ্লিষ্টদের।

২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত জাদুঘরের পূর্ণাঙ্গ এক প্রতিবেদনে জাদুঘরের বেশ কিছু প্রত্নসম্পদ হারানোর বিষয় উঠে আসে। জাদুঘরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সুলতান আহমদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল ওই ইনভেন্টরি তৈরি করেন। এতে ১৯১০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একশো বছরে সংগৃহীত ও হারানো প্রত্নসম্পদের তথ্য প্রকাশিত হয়।

ইনভেন্টরি প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে হারিয়ে গেছে ১৮৫টি প্রত্নসামগ্রীসহ প্রায় তিন হাজার দুর্লভ বস্তু। জাদুঘরে নিবন্ধিত নানা ধরনের প্রত্নসামগ্রীর ১৮৫টির কোনো হদিসই নেই। হারিয়ে যাওয়া প্রত্নসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে দু’টি ব্রোঞ্জ, দু’টি কপার, দু’টি লিনেন, একটি ব্রাশ, দু’টি সিলভার, একটি ক্রিস্টাল, ৪৭টি বিভিন্ন ধরনের পাথর, ১০১টি টেরাকোটা, ১৩টি কাগজ এবং দুটি প্রাণীর চামড়া। এছাড়া পাঁচ হাজার ৯৭১টি নিবন্ধিত মুদ্রার মধ্যে ৩৩টি এবং ১৩ হাজার ৯৩৩টি গ্রন্থের মধ্যে ৮৫টি পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না (পুস্তক, পুস্তিকা, গ্রন্থ, জার্নাল ইত্যাদি) তিন হাজার ৫২টি প্রকাশনা।

বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় উঠলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি উঠে। কিন্তু এর পর তা আর বেশিদুর এগোইনি। এনিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন জানান, এটি নিয়ে আর বেশি না এগিয়ে আগামী দিনে জাদুঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপর জোর দিচ্ছেন তারা। কিন্তু এই বাড়তি নিরাপত্তা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মত কোন পরিবর্তন চোখে পড়েনা। নামমাত্র কয়েকজন আনসার সদস্য লাঠি নিয়েই নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছেন, নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রসহ পাহারাদার দরকার। কিন্তু তারা তা পাচ্ছেননা।

রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের তথ্য মতে, নিরাপত্তার জন্য মোট ১০ জন আনসার সদস্য এখানে দায়িত্ব পালন করেন। তারা পালা করে ৩ জন করে ভাগাভাগি পাহারা দেয়। আনসার সদস্যদের অস্ত্র বলতে রয়েছে একটি করে লাঠি।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জাদুঘরের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই উপেক্ষিত। এমনকি জাদুঘরের গেট বন্ধ থাকা অবস্থাতেও অনেকেই গেট টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। কাউকে বাধা দিতেও দেখা যায়না। এছাড়া মূল ভবনের পাশেই রয়েছে বাসাবাড়ি। এসব বাড়ি থেকে কুব সহজেই প্রাচির টপকে ভেতরে প্রবেশ করা যায়।

নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য আবু সাইদ বললেন, এখানে আমি দুই মাস আগে এসেছি। লাঠি হাতে দায়িত্ব পালন করি। হাতে কোন অস্ত্র নেই। কিছু করার থাকে না। ডিউটি করতেই হয়। অন্ত্র থাকলে তো ভালো হয়। নেই তো কিছু করার নেই। ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়।

নিরাপত্তার বিষয়ে রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক প্রফেসার আলী রেজা মোঃ আব্দুল মজিদ বলেন, এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটি রক্ষার জন্য আমাদের আরো নিরাপত্তার প্রয়োজন। পাশাপাশি আমাদের অন্ত্রসহ প্রহরীর দরকার। এর আগেও আমরা অস্ত্রসহ প্রহরীর জন্য অবেদন করি। তবে সেটি না পেয়ে এখন এভাবেই কর্যাক্রম চলছে। এচাড়া সিসি ক্যামেরা ও স্ক্যানিং মেশিন বসানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তবে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা মনে করেননা এটির আর বেশি তেমন নিরাপত্তার দরকার আছে। এ বিষয়ে তাকে ফোন করা হলে বলেন, এ বিষয়ে জাদুঘর পরিচালকের সাথে কথা বলেন। তবে, জাদুঘরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রয়োজনে আরো ভাবা হবে বলে জানান তিনি।

এসবি/এসএস/জেআর