রাত ৩:৪৭ সোমবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯


দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি তাই চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : ডিসেম্বর ২, ২০১৯ , ১:২৮ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : রাজশাহীর সংবাদ,সাহেব-বাজার বিশেষ
পোস্টটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সেবাস্তিয়ান বিশ্বাস। ডাক নাম শিবু। বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই। রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুরের আন্ধারকোঠা গ্রামে তাঁর বসবাস। তিন ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী, তিন ভাই, বড় ছেলের স্ত্রী ও এক নাতনি মিলে ৭ সদস্যের পরিবার তাঁর। বড় ছেলে লাজারুশ (৩৫) বিয়ে করে বউ ও এক মেয়ে নিয়ে বাড়িতেই থাকেন। ছোট দুই ছেলে রনি (২৩) ও বিলাশ (২০) পাবনা ও ইশ্বরদীতে পুলিশে কর্মরত আছেন। দুই মেয়ে শিখা (৩০) ও পল্লবী (১৮) দুজনই বিবাহিত।

সেবাস্তিয়ান বিশ্বাস রাজশাহী মেডিজেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৬ সালে অবসরে গেছেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ছেলেদের সাহায্য আর পেনশনের টাকা দিয়েই চলছে তার ৭ সদস্যের সংসার। ভারতে প্রায় ২ মাস ট্রেনিং শেষে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক ৭৫ টাকাও পেয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত সকল সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

একান্ত সাক্ষাতৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির দিন আমার ভাই হারিয়ে যায়। সে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করতো। প্রতিদিনের মত সেদিন কাজ করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। আরেক চাচাতো ভাই এভাবে হারিয়ে যায়। সে সময় খুব মারামারি-কাটাকাটি চলছিল, পাকিস্তানিরা যাকে তাকে হত্যা করছিল। সেই দিনটিতেও পাকিস্তানিরা অনেক বাঙালীকে হত্যা করেছিল। আমাদের ধারণা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের মেরে ফেলেছে। এসব ঘটনায় আমাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এছাড়া মূলত দেশের জন্য কাজ করবো, পাকিস্তানিরা যে নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করেছিল সেসব দেখে ঘরে বসে থাকতে পারিনি। যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেই সময় শেখ সাহেব (শেখ মুজিবুর রহমান) বক্তব্য দিল। আমরা রেডিওতে সেই বক্তব্য শুনেছি। মূলত, এসব থেকেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা পাই।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা যা করেছে, তার চেয়ে বেশি নির্যাতন করেছে ‘বিহারীরা’। তারা যেখানে সেখানে মানুষ হত্যা করতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় হটাৎ একদিন গভীর রাতে মানুষ হৈ-চৈ করে রাজশাহী পুলিশ লাইনের দিকে যায়। আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই ছুটাছুটি করে পালিয়ে যায়। কি ঘটনা ঘটেছিল কিছুই বুঝতে পারিনি। তারপরের দিন আবার, রাজশাহীর গীর্জা (খ্রিষ্টানদের গীর্জা, সম্ভবত বহরমপুর) এলাকায় অনেক মানুষ মরে পড়েছিল। অনেক বাঙালী পুলিশকে সেদিন হত্যা করেছিল। পরে আমরা দেখেছি মৃতদের মধ্যে কেউ হাতে পানির গ্লাস নিয়ে আছে, সবাই লাইন ধরে পড়ে আছে। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে আমরা গ্রুপ করে থাকতাম। একটি গ্রামে একজনের বাড়িতে হয়তো ৫ জন থাকতো, মধ্য পাড়াতে গিয়ে আরও ৫ জনের একটি গ্রুপ থাকতো। এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমরা থাকতাম। সেসময় আমার পাশের গ্রামের কামরুজ্জামান, দুলাল, বদিউজ্জামান এরা আমার সাথে ছিল। গ্রুপগুলো সাধারণত ৭, ৯ ও ১১ জন সদস্যের হতো। আর একেকটি ব্যাটালিয়ানে ২শ’, ২শ’ ৫০ বা ৩শ’ জন করে থাকতো।

যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি বলেন, ২৬ মার্চের পরেই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে চলে যায়। সেই সময় আমরা যুদ্ধের কিছুই জানি না। পিস্তল চালাতে জানি না। কোন ট্রেনিং নাই। বাড়িতে জানিয়ে গেলে যেতে দিবে না। তাই, বাবা-মা কাউকে না জানিয়েই চলে যাই। আমাদের এলাকা থেকে সরাসরি শেখপাড়া চলে যায়। সেখানে প্রায় ২৫-২৫ দিন ট্রেনিং নিই। তারপরে সেখান থেকে উন্নত ট্রেনিংয়ের জন্য সরাসরি শিলিগুড়ি চলে যায়। সেখানে পুরো এক মাস অস্ত্রের ট্রেনিং করে ফের দেশে ফিরে আসি। এসে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করি। রাজশাহী অঞ্চলের দারুশা, কর্ণহার, বিলদারামপুর, বিলধরমপুর, পাইকপাড়া, তানোর, মুন্ডুমালা, গোদাগাড়ী, বাগমারাসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করি। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার পর থেকে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে আসিনি। কারো সাথে কোন যোগাযোগও হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধকালীন কষ্টের সময়ের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি ভারতে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার সময়। আমরা যুদ্ধের কিছুই জানি না, কোন ট্রেনিং নাই তাই বাধ্য হয়ে ভারতে ট্রেনিংয়ে যাই। আমরা টানা ৬দিন ৭রাত ট্রেনের মধ্যে ছিলাম। ট্রেনের মধ্যেও কোন জায়গা ছিল না। এছাড়া আমাদেরকে রাখবে এমন জায়াগারও সংকট ছিল। সব জায়গায় বুকিং হয়ে গেছিল। এদিকে, রহরমপুর থেকে ট্রেনে উঠার সময় রাতে মাত্র ২টা পুরি দিয়েছিল সেই পুরি খেয়েই যাত্রা শুরু করি। এই ৬ দিনে আর কোন খাবার খাইনি। পরে ট্রেনিং শেষ করে ‘আখেরীগঞ্জ’ বর্ডার দিয়ে দেশে আসি। ট্রেনিংয়ে সব রকম অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। অস্ত্রের মধ্যে স্টেনগান, এলএমজি, রাইফেল, মাটিতে পুঁতে রাখার ডিনামাইট, ব্রিজ ভাঙ্গার জন্য রকেট লঞ্চার এগুলো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। এসব অস্ত্র ভারত থেকে আমরা নিয়ে আসি।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের ঠিক ২/৩ দিন আগে রাজশাহীর দারুসাতে হটাৎ পাকিস্তানি বাহিনী ঢুকে পড়ে। আমরা জানতেই পারিনি। পরে তাদের সাথে মুখোমুখি গুলি বিনিময় হয়। তারাও ফায়ার করে, আমরাও করি। তবে সে ঘটনায় আমাদের কেউ আহত হয়নি। তাদের হয়েছিল কিনা বলতে পারবো না। তাদের কাছে যেহুতু গাড়ি ছিল, কেউ আহত বা মারা গেলে তারা হয়তো লাশ নিয়ে চলে যেতে পারে। এই ঘটনার আগে তানোরে আরেকটি ঘটনা ঘটে। সেই সময় আমাদের একজনকে পাকিস্তানি বাহিনী ঘরের মধ্যে বন্দী করে রেখেছিল। খবর পেয়ে আমরা সবাই গিয়ে তাদেরকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলি। তারপর গুলি করে তাদেরকে বিতাড়িত করে ওই লোককে উদ্ধার করি। এছাড়া, বাগমারাতেও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় আমাদের সাথের একজন আহত হয়। তার পায়ে (হাঁটুর উপরে) গুলি লাগে। পরে চিকিৎসা করে ভাল হয়। আমরা সবসময় ডিউটিতে থাকতাম। কেউ বিশ্রাম নিলে অন্যরা ডিউটি করতো। তারপর কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকলে আমরা আগেই ওই জায়গা থেকে সরে যেতাম। ফলে আমরা একসাথে যারা ছিলাম তারা তেমন হতাহত হইনি। কাজিহাটার কমান্ডার শামসুল হুদার অধীনে আমরা ৯ জনের একটি গ্রুপ ছিলাম। সেসময় আমরা যেমন বিভিন্ন জায়গায় ছিলাম, রাজাকাররাও সব জায়গায় ছিল। বিভিন্ন ব্রিজ, এলাকায় তারা থাকতো।

রাজাকাররা কোন ক্ষতি করতো কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ ক্ষতি করতো, আবার কেউ কেউ করতো না। তাদের মধ্যে অনেককে জোর করে রাজাকার বানানো হয়েছিল। কাজ না করলে পাকিস্তানিরা হুমকি দিতো, মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন কাজ করাতে বাধ্য করতো।

বর্তমানের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন মোটামুটি ভালই আছি। আমাদের পৈতৃক কোন জায়গা জমি নাই। যেই যায়গায় বসবাস করছি সেটি মিশনের জমি। প্রতিমাসে ১০ হাজার করে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও ৩ ছেলের ছোট ২ ছেলে পুলিশে চাকরী করে তারা কিছুটা সহযোগিতা করে। আর মেডিকেল থেকে ২০১৬ সালে রিটায়ার্ড করেছি সেখান থেকে প্রতি মাসে ৪-৫ হাজার টাকা করে পেনশন পাই। এসব দিয়েই সংসার চলে যাচ্ছে। এগুলো ব্যতীত আয়ের অন্য কোন উৎস নাই। সব মিলিয়ে ভালোই আছি। নিজের চাওয়া-পাওয়া, প্রত্যাশা নিয়ে বলেন, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, আমাদের চাওয়া পাওয়া কিছু নাই। আমরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি দেশের জন্য, দেশকে ভালবাসি তাই। সেই সময় দেশে যে নির্যাতন-নিপিড়ন শুরু হয়েছিল মানুষের সেসব কষ্ট দেখে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছি। তাই আমাদের চাওয়া পাওয়া কিছু ছিল না, এবং নাই। এখন অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার খবর শুনি। এসব শুনে কষ্ট লাগে, দেশের জন্য যুদ্ধ করতে কতজন পারে? কিন্তু, কতিপয় লোকেরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে এই সম্মানটা নষ্ট করছে। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের যে ভাতা দিচ্ছে আমরা সেটা চাইনি, সরকার চেয়েছে তাই দিচ্ছে। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি এই দাবিতে কোন কিছু চাওয়ার নাই। তবে, শেখ সাহেব (শেখ মুজিবুর রহমান) যুদ্ধের পরে মাসিক ৭৫ টাকা করে দিতো সেটা পেতাম। সেটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হল থেকে নিয়ে আসতাম। তিনি মারা যাওয়ার পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার ফের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছেন এটি অনেক ভাল হয়েছে।

ছেলেদের চাকরীর বিষয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সুপারিশ দিয়ে ছোট দুই ছেলের পুলিশে চাকরী হয়েছে। শুধু যে, মুক্তিযোদ্ধা সুপারিশ দিয়েই হয়েছে সেটা নয়, তার সাথে বিভিন্ন জায়গায় কিছু সালামী, চা-পানি (ঘুষ) দিতে হয়েছে। এছাড়া বড় ছেলের জন্য কিছু দেয়নি, তার চাকরীটাও হয়নি। উপর লেভেলে যারা আছে তারা বলে চাকরী এই আজ হবে, কাল হবে, এভাবে ছেলের চাকরীর বয়সটাও পার হয়ে গেল কিন্তু চাকরী হলো না। হয়তো কিছু টাকা-পায়সা খরচ করলে চাকরীটা হয়ে যেত। এসব বিষয় নিয়েই মনটা খারাপ হয়। যে মুক্তিযুদ্ধ করেও শুধু মুক্তিযুদ্ধের সুপারিশ দিয়ে কোন চাকরী হয় না। তার সাথে টাকা-পায়সা খরচ করতে হয়। প্রত্যেকটি মানুষের কিছু আশা থাকে কিন্তু, আশাটা পূরণ হলো না।

 

এসবি/এমই