বিকাল ৫:৫৭ রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯


দুর্নীতিই উন্নয়নের প্রধান বাধা: দুদক চেয়ারম্যান

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : March 26, 2018 , 7:17 pm
ক্যাটাগরি : আলাপচারিতা
পোস্টটি শেয়ার করুন

সাহেব-বাজার ডেস্ক : দুর্নীতিই উন্নয়নের প্রধান বাধা। এই দুর্নীতিই ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সাম্য ও গণতন্ত্রের হুমকি। উন্নয়নের এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। আজ থেকে শুরু হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ-২০১৮। এ কর্মসূচি পালনে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এ উপলক্ষে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সমকালের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। ঘুষ, অর্থ পাচার, সরকারি অফিসে দুর্নীতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।

সমকাল : দুর্নীতি দেশের অন্যতম সমস্যা।

এ সমস্যা দূর করতে আর কত অপেক্ষা?

ইকবাল মাহমুদ : বাংলাদেশ আজ বিশ্বদরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে সুষমভাবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিকতা বা অন্য কোনো বিভাজনকে ন্ন্নূতম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- দুর্নীতিই আজকের বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা। দুর্নীতি যে কোনো দেশেরই উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সাম্য ও গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দুর্নীতি রয়েছে। এই দুর্নীতির ব্যাপকতা, প্রকৃতি, মাত্রা, ক্ষেত্র এবং কৌশল ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে নানা কৌশল, পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে। তবে বিগত দুই বছরে টিআইর ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমার মন্তব্য হলো, ট্রেন গন্তব্যের উদ্দেশে ছাড়া হয়েছে। সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করা হলে ট্রেনটি অবশ্যই গন্তব্যে পৌঁছবে, তবে কিছুটা সময় লাগবে। রাতারাতি পৃথিবীর কোনো দেশেই দুর্নীতি বন্ধ হয়নি।

সমকাল : দুর্নীতি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে বিশ্বে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কতটুকু এগিয়েছেন?

ইকবাল মাহমুদ : অবশ্যই এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। দুর্নীতি করলে আইনের মুখোমুখি হতে হবে- দুর্নীতিবাজদের কাছে অন্তত এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দেশের আইন সবাইকে মানতে হবে।

সমকাল : আপনারা দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে বারবার সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ কতখানি সোচ্চার?

ইকবাল মাহমুদ : পদ্ধতিগত ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। কমিশন সে লক্ষ্যেই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতিগত উন্নয়নের সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সহজ হবে। কমিশনের প্রতিরোধমূলক কাজে সরকার, শিক্ষক প্রশাসন, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজসহ সব পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আলাদা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে। সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।সাধারণ মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবশ্যই সোচ্চার। ২০১৭ সালে কমিশনে ১৭ হাজার ৯৫৩টি অভিযোগ এসেছে। এর অধিকাংশই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া।

সমকাল : আপনি বলেছেন, দুর্নীতির কারণেই দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থানও হচ্ছে না। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনায় বিনিয়োগ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বেড়েছে কি?

ইকবাল মাহমুদ : দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলের আলোকেই আমি এ মন্তব্য করেছি। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন সুশাসন। আর সুশাসনের পূর্বশর্ত হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত সরকারি পরিসেবা, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয়। দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম অবশ্যই বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখে।

সমকাল : কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নানা অভিযান পরিচালনা করেছেন। এই অপরাধ বন্ধে তেমন সাফল্য অর্জিত হয়েছে কি?

ইকবাল মাহমুদ : এ অভিযানের সাফল্য পরিমাপের কোনো মানদণ্ড আমাদের কাছে নেই। তবে সরকার, শিক্ষক, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম- সবাই তো কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছেন। এটাও এক ধরনের সাফল্য।

সমকাল : টিআইর এবারের ধারণা সূচকে স্কোর ২ পয়েন্ট বেড়েছে। এর অর্থ দুর্নীতির মাত্রা কিছুটা কমেছে। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয়, দুর্নীতি এখনও উদ্বেগজনক। আপনার মন্তব্য কী?

ইকবাল মাহমুদ : টিআইর ধারণা সূচকে স্কোর ২ পয়েন্ট বৃদ্ধি একেবারে নগণ্য নয়। আমরা আশান্বিত। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমি মনে করি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।

সমকাল : ঘুষের বিরুদ্ধে আপনারা শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। ঘুষ কি কমেছে?

ইকবাল মাহমুদ : ২০১৭ সালের শুরুতেই আমরা বলেছিলাম, ঘুষখোররা ঔদ্ধত্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে কমিশন একই বছরে ২৪টি ফাঁদ পেতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘুষখোর কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে। একই সঙ্গে মামলা করা হয়। এই ফাঁদের কারণে ঘুষ গ্রহণের প্রবণতা কিছুটা হলেও কমেছে। ফাঁদ পাতা অব্যাহত আছে।

সমকাল : সরকারি অফিসে দুর্নীতি রোধকল্পে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছেন? সবিস্তারে খোলামেলা শুনতে চাই।

ইকবাল মাহমুদ : সরকারি অফিসে দুর্নীতি বন্ধে পদ্ধতিগত উন্নয়ন ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। সে লক্ষ্যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ২৫টি প্রতিষ্ঠানে কমিশনের ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিমের কঠোর নজরদারি অব্যাহত আছে। গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। পদ্ধতিগত উন্নয়নের মাধ্যমে দুর্নীতির ফাঁক-ফোকর বন্ধে ওই ২৫টি প্রতিষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট সুপারিশও পেশ করা হয়েছে। দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। এমনকি প্রথমবারের মতো সরকারি অফিসের দুর্নীতির টাকাও উদ্ধার করা হয়েছে।

সমকাল : ব্যাংকে গচ্ছিত জনগণের অর্থ অবাধে লুটে নিচ্ছে একটি চক্র। এই চক্রকে কীভাবে মোকাবেলা করবেন?

ইকবাল মাহমুদ : গত দুই বছরে দুর্নীতির অভিযোগে ১১২ জন ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্যাংকের আইন ও বিধি অনুসারে ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করলে দুদক কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না। তবে জালিয়াতি করে ব্যাংকের অর্থ তথা জনগণের অর্থ কেউ আত্মসাৎ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ কাগজপত্র জমা দেওয়া হবে। ওইসব কাগজপত্র যাচাই করে নিয়ম অনুযায়ী ঋণ দেওয়া হবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

সমকাল : অর্থ পাচার বন্ধে কী কী পদপে গ্রহণ করেছেন?

ইকবাল মাহমুদ : এদেশের মাটি, পানি, জলবায়ুতে বড় হয়ে যারা এদেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করে, তারা দেশদ্রোহী। বিদেশে বসে তারা এই সম্পদ ভোগ করতে পারবে না। তাদের এই কল্পিত সুখ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধুলায় মিশিয়ে দিতে যা যা করা দরকার দুদক তা করবে। এ লক্ষ্যে কমিশন সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ইতিমধ্যে ৩২ জনের অর্থ পাচার বিষয়ে বিভিন্ন দেশে এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করেছে। তাই অর্থ পাচারকারীদের আমলনামা একটা পর্যায়ে পাওয়া যাবেই। অর্থ পাচার বন্ধের মূল দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের।

সমকাল : আপনাদের মামলার রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাগারে।সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

ইকবাল মাহমুদ : দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত একটি চলমান প্রক্রিয়া। যার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির তথ্যবহুল, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাবে, তা অবশ্যই আইন-আমলে নেওয়া হবে।

সমকাল : দুর্নীতি দমনে হটলাইন ‘১০৬’ চালু করেছেন। জনগণের কতটুকু সাড়া পাচ্ছেন?

ইকবাল মাহমুদ : দুদক অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ‘১০৬’ দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর জনগণের একটি সহজ পথ। এ কারণেই মাত্র ৫ মাসে ৫ লক্ষাধিক কল এসেছে।

সমকাল : গণশুনানিতে তালিকাভুক্ত কিছু মানুষ অভিযোগ করতে পারে। সব মানুষ অভিযোগ করার সুযোগ পায় না। অনেকে মনে করেন, এই গণশুনানি অর্থহীন- আপনার মন্তব্য।

ইকবাল মাহমুদ : গণশুনানি হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহির একটি পদক্ষেপ মাত্র। গণশুনানি পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি আছে কি-না, কমিশন তা পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজনে গবেষণার মাধ্যমে এটি বিচার-বিশ্নেষণ করা হবে।

সমকাল : দুদকের ভেতরের দুর্নীতি বন্ধে আপনি একাট্টা। কতটুকু সফল হতে পেরেছেন?

ইকবাল মাহমুদ : দুদকের ভেতরে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে- এ কথা এখনই বলা যাবে না। তবে দুর্নীতি কমেছে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুদকের অভ্যন্তরে অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে প্রক্রিয়া চলমান। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটির নজরদারি অব্যাহত আছে।

সমকাল : দুর্নীতি মামলায় সাজার হার বেড়েছে। শতভাগ সাজা নিশ্চিত হবে কি?

ইকবাল মাহমুদ : দুর্নীতি দমনে কমিশন নতুন নতুন পদক্ষেপ ও কৌশল প্রয়োগ ইতিমধ্যে শুরু করেছে। এ কারণে সাজার হার ২০১৭ সালে ৬৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৩৭ ও ২০১৬ সালে ছিল ৫৪ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে আমরা ধারাবাহিকভাবে এগোনোর চেষ্টা করছি।

সমকাল : টিআইবিসহ সংশ্নিষ্টরা প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এ পরামর্শ আমলে নিয়েছেন কি?
ইকবাল মাহমুদ : কমিশন সবার পরামর্শকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তবে এসব পরমর্শ গ্রহণ প্রক্রিয়া, মাত্রা ও উপযুক্ত সময় কমিশনকেই নির্ধারণ করতে হয়।

সমকাল : বর্তমান কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। মানুষের এই প্রত্যাশা পূরণে আরও পদক্ষেপ নেবেন কি?

ইকবাল মাহমুদ : কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপই মানুষের আস্থা বৃদ্ধির জন্য নেওয়া হয়। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে কমিশন যে কোনো সময় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

সমকাল : বর্তমান কমিশনের দুই বছর পার হয়েছে। আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

ইকবাল মাহমুদ : এ ক্ষেত্রে আমি গণমাধ্যমসহ দেশের মানুষের মন্তব্য জানতে চাই। আমার মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। তবে এ কথাও ঠিক; আমার এই দুই বছর কর্মকালে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, সরকার, প্রশাসনসহ সবাই অকৃত্রিম সমর্থন দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তাদের এই অকৃত্রিম সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

সূত্র: সমকাল