সন্ধ্যা ৬:৪২ বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯


গ্যাস খাতে দুর্নীতির খেসারত দেবে জনগণ?

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : July 5, 2019 , 12:54 pm
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

সাহেব-বাজার ডেস্ক : গত ১০ বছরে গ্যাসের দাম বেড়েছে সাতবার। এর মধ্যে সব থেকে বেশি বেড়েছে আবাসিকের চুলায়, সিএনজি ও শিল্পকারখানার ক্যাপটিভ বিদ্যুতে। প্রথম দুটির ভোক্তা সরাসরি সাধারণ মানুষ। তৃতীয়টি শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হয়। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে জনগণের কাছ থেকেই বাড়তি টাকা তুলে নেন। আর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শ্রমিকের বেতনের ওপর কোপ পড়ে। শেষতক জ্বালানি পণ্য গ্যাস বা তেলের দাম যা–ই বাড়াক সরকার বাহাদুর, তার দায় সাধারণ মানুষের ওপরই গিয়ে বর্তায়।

গ্যাসের বাড়ার কারণ হিসেবে সরকারের যুক্তি হলো, বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে তা কম দামে দেওয়ায় বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এটি সমন্বয় করার জন্যই এখন দাম বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারে যা দাম তার চেয়ে বেশি দামে গ্যাস কিনছে কেন সরকার?

সরকারের যুক্তি হলো বিজ্ঞাপনের মতো আধা সত্য। দেশে গ্যাস–সংকটের কারণেই সরকার এলএনজি আমদানি করছে। কিন্তু গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে গত ১০ বছর সরকার বিশেষ কিছু করেনি। এলএনজি আমদানি করার ব্যাপক পরিকল্পনা ১০ বছর ধরেই সরকার করলেও এ সময় স্থল ও সাগরভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য তেমন কিছু করেনি। এভাবে গ্যাস–সংকট অনিবার্য করে তুলে উচ্চমূল্যের এলএনজির দাম ভোক্তার কাঁধে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্পূর্ণ সত্যটা হলো, বাংলাদেশ যখন ৮০০ টাকার গ্যাসের দাম ১৭৫ টাকা বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা করেছে, ভারত তখন ৭৬৩ রুপির গ্যাসের দাম ১০১ রুপি কমিয়ে ৬৬২ রুপি করেছে। বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কমেছে যখন ৫০ শতাংশ, তখন আমরা বাড়িয়েছি গড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ।

স্থানীয়ভাবে গ্যাসের সহজপ্রাপ্যতার সব সম্ভাবনাও সরকার নষ্ট করে দিচ্ছে। স্থলভাগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স বহু বছরব্যাপী গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন সফলতার সঙ্গে করলেও সম্প্রতি রাশিয়ার গাজপ্রম, আজারবাইজানের সোকারের মতো বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে গ্যাসকূপ খননের কাজ করছে। যেখানে বাপেক্সের প্রতিটি কূপ খননে লাগছে ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা, সেখানে বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে নিচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সারা দেশের স্থলভাগে ১১০টি কূপ খনন করা হবে। এসব কূপ যদি গাজপ্রম ও অন্যান্য বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে করা হয়, তাহলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হবে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কম দামে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে এভাবেই।

আবাসিকে গ্যাস–সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনবে। এর বাইরে একের পর এক এলপিজি কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের আইনি এখতিয়ার বিইআরসির হাতে থাকলেও তারা কখনোই এলপিজির দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখেনি।

এই বাস্তবতায় সরকার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি না করে যেটি করতে পারত তা হলো, গ্যাস খাতের দুর্নীতি বন্ধে ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া। সেটি সরকার নেয়নি।

আবার দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইনি যেসব প্রক্রিয়া আছে, সেখানেও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) শিথিলতা দেখিয়েছে। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর বেআইনি প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করেছে। কারণ, আইনে আছে একবার দাম বাড়ালে ১২ মাসের মধ্যে ফের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসিতে আসা যায় না। গত বছরের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল, সে সময় গ্যাসের বাড়তি দাম গ্রাহককে দিতে হয়নি। এক বছরের জন্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা সরকার দিয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, লাভে থাকলে বিতরণ কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে না। বিইআরসি আইনের এমন দুটি ব্যত্যয় ঘটিয়ে শুনানি গ্রহণ করে। সেই শুনানি শেষে গত ৩০ জুন গড়ে ৩৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।

জনগণের পকেট থেকে ১০ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা
এলএনজি আমদানির কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রয়োজন হবে ১৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকা । প্রতি ইউনিট এলএনজি স্পটে মার্কেটে যেখানে ৬ থেকে সাড়ে ৬ ডলারের মধ্যে, সেখানে গড়ে সাড়ে ৯ ডলারে কিনছে সরকার। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বা দরপত্রের মাধ্যমেও দীর্ঘমেয়াদি এসব এলএনজি কেনেনি সরকার। ফলে সরকারি কেনাকাটা নিয়ে নানান প্রশ্ন রয়েছে। ১৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকার মধ্যে সরকার দেবে ৭ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। দাম বাড়ানোর কারণে আয় হবে ৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা আসবে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে। এ অর্থও জনগণের দেওয়া গ্যাস বিল থেকে জমানো হয়। সে অর্থে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে গ্রাহকের পকেট থেকে কাটা যাবে ১০ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

চুরি ঠেকাতে উদ্যোগ নেই
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর ‘তিতাসে “কেজি মেপে” ঘুষ লেনদেন’ শিরোনামে প্রথম আলোতে খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘুষ ওজনে মেপে নিচ্ছেন। গত ছয় মাসে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (অতিরিক্ত) দায়িত্বে আছেন মোস্তফা কামাল। তিনি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিতাসের আইন অনুযায়ী তাঁর তিতাসের এই পদে থাকার কথা নয়। তবে তিনি দায়িত্বে আসার পর তিতাসে চুরি আরও বেড়েছে। আগে যেখানে তিতাসের সিস্টেম লস ছিলই না, মাঝেমধ্যে সেটি ২ শতাংশের মধ্যে থাকত, সেই তিতাসে এখন সিস্টেম লস গড়ে ১২ শতাংশ। তিতাসে এখন প্রতি মাসে চুরি যাওয়া গ্যাসের মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। বছরে যা ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মতো। এ চুরি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনেনি সরকার।

তিতাসের আরও একটি বড় চুরি হলো, আবাসিক গ্রাহকের গ্যাস। যাঁরা বাসায় দুই চুলা ব্যবহার করেছেন, তাঁরা বিল দিতেন মাসে ৮৫০ টাকা। তিতাস বাসাবাড়িতে ৮৮ ঘনমিটার গ্যাস গ্রাহক ব্যবহার করবেন এমন আন্দাজ করে (প্রতি মিটারের দাম ৯ টাকা ১০ পয়সা ধরে এর সঙ্গে অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে) ৮৫০ টাকা বিল ধরেছে দুই চুলার জন্য। কিন্তু যাঁদের বাসায় মিটার রয়েছে, তাঁদের প্রতি মাসে ৪০০ টাকার মতো গ্যাস তাঁরা ব্যবহার করেন। রাজধানীতে সামান্য কিছু বাসায় তিতাস মিটার দিয়েছে। মোট ব্যবহৃত গ্যাসের ১৬ শতাংশ গ্যাসকে আবাসিকে ব্যবহার দেখানো হয়। তাহলে বাস্তবে আবাসিকে গ্যাস ব্যবহৃত হয় ৮ শতাংশ। এই ৮ শতাংশ আর চুরির ১২ শতাংশ বা সিস্টেম লস যদি যুক্ত করা হয়, তাহলে মোট চুরি করা গ্যাসের অর্থ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা প্রতি মাসে হয়। আর তা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এটি শুধু তিতাস অঞ্চলের হিসাব। চুরির সিংহভাগ যায় শিল্পকারখানায়। সামান্য কিছু চুরির গ্যাস বাসাবাড়িতেও ব্যবহার হয়। দীর্ঘদিন শিল্পে ইভিসি মিটার বসানোর দাবি খোদ শিল্পমালিকদের থেকে এলেও তিতাস সেই মিটার বসায়নি। কারণ, ইভিসি মিটার বসালে তিতাসের চুরি ধরা পড়ে যাবে। এ ছাড়া আবাসিকে প্রিপেইড মিটার বসানোর কাজ এতই ধীর যে বর্তমান গতিতে প্রিপেইড মিটার স্থাপন অব্যাহত থাকলে আগামী ১০০ বছরেও সেটি সম্পন্ন হবে না।

শেষ করছি তিতাসের ঘুষখোর কর্মকর্তাদের তালিকা দিয়ে। সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত কমিশনে স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘুষখোর কর্মকর্তারা নিজেদের সম্পদের বিবরণ দিয়েছিলেন। তিতাসের আত্মস্বীকৃত ঘুষখোর কর্মকর্তাদের কিছু হয়নি। বরং তাঁরা দেশের সব থেকে বড় এই প্রতিষ্ঠানের কাঁধে সিন্দবাদের ভূতের মতো চেপে বসেছেন। সম্প্রতি জ্বালানি মন্ত্রণালয় ট্রুথ কমিশনে অবৈধ সম্পদের তথ্য স্বীকার করা কর্মকর্তাদের তালিকা চেয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে ৪২ জন কর্মকর্তার নাম পড়েছে। তবে এসব কর্মকর্তার কিছু হয়নি। তাঁদের বিষয়ে বিইআরসির কোনো আদেশ নেই, তাঁদের দুর্নীতি রুখতেও বিইআরসির কোনো পরিকল্পনা নেই। সব দায় জনগণের। কারণ, তারা এই দেশে জন্মগ্রহণ করেছে।

লেখক: মো. আরিফুজ্জামান, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক।