রাত ৮:৩০ শনিবার ১৯ অক্টোবর, ২০১৯


গণ্ডির মধ্যেও নড়াচড়া সম্ভব।। হাসান আজিজুল হক

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯ , ৮:২৫ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

হাসান আজিজুল হক

স্বাধীনতার প্রসঙ্গ দিয়েই সরাসরি শুরু করা যেতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশের যে কোনো মানুষ বলতে পারেন- আমি স্বাধীন। সংবিধানে একজন মানুষের কী কী স্বাধীনতা রয়েছে, তা লিপিবদ্ধ থাকে। সাধারণ মৌলিক অধিকারগুলো তো রয়েছেই- জীবনের ওপর অধিকার, কর্মের ওপর অধিকার ইত্যাদি। তা ছাড়াও একজন মানুষ হিসেবে অন্যান্য স্বাধীনতাও রয়েছে। সেও কথা বলতে পারবে, মত প্রকাশ করতে পারবে। এসব লিপিবদ্ধ থাকে, আমাদের সংবিধানেও লিপিবদ্ধ রয়েছে।

স্বাধীনতা শব্দটাকে আমরা সেরকমভাবে খুঁটিয়ে কখনোই দেখি না। মনে করি সবই স্বাধীন। কিন্তু ভেতরের একটা বিরোধ থেকে যায়- একটা অন্তর্বিরোধই। সে বিরোধটাকে অতিক্রম করা খুব কঠিন। হেগেল ও মার্কসের পদ্ধতিই ঠিক, স্বাধীনতার কথা বললে অধীনতার কথাও এসে যায়। আসল কথা হলো, পরাধীনতার বিষয়টা যদি না থাকত, তাহলে স্বাধীনতার কথা উঠতই না। উঠছে এ জন্যই, এখানে পরাধীনতার বিষয়টিও আছে। সুতরাং সে জায়গা থেকে দেখলে, আমরা যে মানুষটিকে স্বাধীন বলছি, সে মানুষটি একই সঙ্গে পরাধীনও বটে।

কতকগুলো অধীনতা রয়েছে তা একেবারে প্রদত্ত, যেমন- একই সঙ্গে দুই জায়গায় উপস্থিত থাকবে- এই স্বাধীনতা কোনো ব্যক্তিরই নেই। কেউ যদি বাসে উঠে দাঁড়িয়ে এমনভাবে হাত নাড়াতে থাকে যে অন্যের নাকে-মুখে গিয়ে তার কনুই লাগে, তাহলে তিনি বলতেই পারেন আপনার স্বাধীনতা আমার নাকের ঠিক আগ পর্যন্ত। স্বাধীনতার ভেতরেই নিয়ন্ত্রিত অধীনতা আছে বা চাপানো অধীনতা আছে। আমরা কখনোই সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন হতে পারি না। যে যে ক্ষেত্রে স্বাধীন হতে পারি না, তার অগ্রজ ফর্দ তৈরি করা যাবে। দাম্পত্য জীবনে কি পুরোপুরি স্বাধীন হওয়া যায়? পারিবারিক জীবনে কি সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়া সম্ভব? কিছু কিছু অধীনতা তো মানতেই হয়। এবার কথাটা তুলি রাষ্ট্রের জীবনে কি সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়া সম্ভব? এখানে ছোট্ট অথচ তীব্র একটা উদাহরণ দিই। আমাদের দেশের প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পাওয়ার স্বাধীনতা তো নিশ্চিত করা আছে। আইন আছে, কাউকে বিনাবিচারে দণ্ড দেওয়া যাবে না ও শাস্তি দেওয়ার আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি আমি সাধারণত আলোচনায় আনতে চাই না। এ দুটি বিষয় এতই আপেক্ষিক, এসব শব্দ দিয়ে এখন প্রায় কিছুই বোঝানো যায় না।

খবরের কাগজের কী ধরনের নৈতিকতা অবলম্বন করা উচিত, এর জবাব দেওয়া কঠিন। আমরা সংঘবদ্ধ জীবনে বাস করি। তাকে আমরা সমাজ বলছি, দেশ বলছি, রাষ্ট্র বলছি। রাষ্ট্র এক ধরনের অবকাঠামো। কোনো একটা স্ট্রাকচার ছাড়া, একটা আকার ছাড়া রাষ্ট্র হতে পারে না। তত্ত্বের কথা বলছি না। চোখটা খোলা রেখে আমাদের এই বাংলাদেশের দিকে তাকালে খুব সহজেই বোঝা যাবে অবকাঠামো একটা আছে। ক্ষমতা ছাড়া অবকাঠামো অর্থহীন, ক্ষমতার প্রয়োগ হতেই হবে। ক্ষমতার প্রয়োগ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র নেই। গণতন্ত্রে বলা হয়, শাসককে রাষ্ট্র শাসন করার জন্য অবশ্যই শাসিতের সম্মতি গ্রহণ করতে হবে। আমাদের অবকাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে আইন করার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে, আইন প্রয়োগ করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। আইন ঠিকমতো প্রয়োগ হলো কি-না, তা দেখার জন্যও ব্যবস্থা রয়েছে। তার মানে একটা চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স। প্রয়োগ, সুষ্ঠু প্রয়োগ, এর যদি কোনো রদবদল ঘটে, নড়চড় হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্নটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করতে বাধ্য যে, নড়চড় অনবরত হচ্ছে। একটা অবকাঠামো আছে এবং এ অবকাঠামোর যে পরিবর্তন ঘটছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ কোনো মৌলিক পরিবর্তন এখনও ঘটেনি। পুঁজির বিকাশ ঘটেছে, না বিকাশ কিছুই ঘটেনি। পুঁজিবাদ ভালো হোক মন্দ হোক, পুঁজিবাদ বলতে নাকি উৎপাদন বোঝায়। মুক্তবাজারে কিন্তু আমাদের উৎপাদন নেই। ভাত মেখে মুখে তুলে দিয়ে বলা হলো, দয়া করে তুমি গিলো। গার্মেন্টস যারা ম্যানেজমেন্ট করেন তারা বাইরে থেকে সুতা নিয়ে আসেন, মেশিন নিয়ে আসেন, কাপড়, ডিজাইন সব। তারপর তৈরি করে কে? গার্মেন্ট শ্রমিক। শ্রমের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। সে হিসেবে দাঁড়াচ্ছে, এ দেশের শ্রম কাজে লাগিয়ে যা তৈরি করা হচ্ছে, তাই আমাদের গার্মেন্ট শিল্প।

গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের সম্মতি নিয়ে আসছে। তবু যে অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে তা একটানা একইভাবে চলছে। এর সঙ্গে সারাবিশ্বের কথা আছে। একটা আরেকটার সঙ্গে যুক্ত হয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ কিছু ঘটছে না। দেশে কিছু মানুষের হাতে ক্রমাগত টাকা জমা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ ক্রেতা হতে বাধ্য হচ্ছে। খবরের কাগজ এই অবকাঠামোর মধ্যেই তো। তার বাইরে নয়। বাইরে যদি কেউ থাকার চেষ্টা করে, তাহলে অবকাঠামোর নিজস্ব নিয়মই তাকে গুঁড়িয়ে দেবে। সে থাকতে পারবে না। যদি খবরের কাগজওয়ালাদের বলা হয়, এক পয়সাও বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে না, তাহলে ক’টা কাগজ বেরোবে? বিজ্ঞাপন দেবে কে? সরকার, বড় বড় প্রতিষ্ঠান তো? তাহলে খবরের কাগজ বা খবরের কাগজের কর্তৃপক্ষের মূল স্বাধীনতা কোথায়? এ প্রশ্নও উঠতে পারে।

কেউ বলতেই পারেন, আপনি আলো এবং অন্ধকার আলাদা করে ফেললেন। ভাগ মাত্রই দুটি- কালো আর সাদা। কালো-সাদা মিশিয়ে সাদাটাকে একটু কম সাদা, কালোটাকে একটু কম কালো করে তো একটা কিছু করা যায়। এ কথাটা মিথ্যা নয়। দ্বন্দ্ব থাকবে, এক ধরনের সম্মিলন ছাড়া দ্বন্দ্বও শেষ পর্যন্ত চালানো সম্ভব নয়। নীল হালকা হতে হতে এক সময় সাদার দিকে চলে যাবে। ফলে খবরের কাগজের এই যে নিয়ন্ত্রণটা তা অল্পবিস্তর আলগা তো হবেই। তা অবশ্য নির্ভর করবে অবকাঠামোর কোন জায়গাটায় সে আছে, কোনটাকে সে তার লক্ষ্য বলে স্থির করেছে। আমি একশ’ভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারব না যে, শ্রেণি মানুষকে একশ’ভাগই দখল করে নেয়।

আসলে নির্দিষ্ট হোক- গণ্ডির মধ্যেও নড়াচড়া করা সম্ভব। যত কড়া রকমের কাগজগুলো দেখুন, প্রত্যেক কাগজের আলাদা বিশেষত্ব আছে। আমরা যা লিখি তা অনেক কাগজ ছাপতে পারে না আবার কোনো কোনো কাগজ ছাপে। সমস্ত সত্যই যদি তৈরি করে নেওয়া হয়, তাহলে অপক্ষপাত বলে কিছু তো থাকে না! যারা কোনো বিষয়ে পক্ষপাত করেন, তারা নানা যুক্তিতে বিষয়টিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। লজিক এমন একটা শাস্ত্র, যা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে উপস্থাপন করতে পারে। সে ক্ষমতা অনেকেরই আছে এবং খবরের কাগজের সে ক্ষমতা বিপুল পরিমাণে রয়েছে। আজকের পৃথিবীতে খবরের কাগজ একটা অসম্ভব শক্তি-কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।

রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলোর একটা বলা হতো খবরের কাগজকে এবং এখনও বলা হয়। তাকে উপেক্ষা করা যায় না। তাই এ শক্তি কোন দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তা একটা বড় ব্যাপার। নতুন কাগজ বেরোলেই আমরা তার দিকে তাকিয়ে থাকি, এ কাগজটা কোন দিকে ঝুঁকে পড়ছে তা বোঝার জন্য। সে কাগজ যতই বলুক না কেন, আমরা বিশুদ্ধ সত্য ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করি না! শেষ পর্যন্ত নির্বিকার অপক্ষপাত বলে কিছু নেই। পৃথিবীব্যাপী সাংবাদিকতারই পরিবর্তন হচ্ছে। মার্কিন সাংবাদিকদের কায়দা দেখি। তারা বলে থাকেন, ওরা সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ পরিবেশন করেন। একজন অপরাধীর কাছ থেকে পাওয়া সব তথ্য প্রকাশ করা হলো। যে শিকার হয়েছে, তারও বক্তব্য হুবহু প্রকাশ করা হলো। আর যারা এর সঙ্গে যুক্ত আছে, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য অক্ষরে অক্ষরে প্রকাশ করা হলো। প্রতিবেদকের কোনো বক্তব্য দেওয়া হলো না। এর একটাই মানে দাঁড়াল, প্রতিবেদক তার নিজস্ব কোনো মতামত প্রকাশ করলেন না। তার মানে পত্রিকার কোনো নিজস্ব বক্তব্য বা মত নেই। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে শুধু ঘটনা প্রকাশ করা হলো। মানেটা দাঁড়াল, ঘটন-অঘটন নিয়ে ধুয়ে খাও, আমরা কিছুই বলছি না। উহ, কী ভয়ঙ্কর ফাঁদ! এর থেকে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে? এখানে উদাহরণ হিসেবে কুরোশিওর একটি বিখ্যাত ফিল্মের উল্লেখ করা যেতে পারে। দুর্গম বনপথ দিয়ে এক যুগল যাচ্ছিল। কুখ্যাত এক ডাকাত পুরুষটিকে হত্যা করে। ডাকাতের জায়গা থেকে দেখানো হয়, ব্যাপারটা কী ঘটেছিল। যে পুরুষটাকে মেরে ফেলা হয়েছে, তার সঙ্গিনীর জায়গা থেকেও দেখানো হয়। প্রত্যেকটা ব্যাপারই আলাদা, কিন্তু কাণ্ড একটাই। এ এক ধরনের ধাঁধা-জাল- তুমি কেমন করে সত্য বের করবে?

প্রকৃতপক্ষে এভাবে সত্য বের করা যায় না। সত্য বের করার আসলে দরকার নেই। দরকার করণীয়গুলো বের করা। জায়গা নেওয়া দরকার, কর্ম দরকার। আর তথ্য বা ঘটনা ফ্যাক্ট তো অবশ্য খুঁজে বের করতেই হবে।

খবরের কাগজ অনেক বেরিয়েছে বর্তমানে। ভবিষ্যতেও বেরোবে। তাতে ইতরবিশেষ কিছু হবে না। দেশের সাধারণ মানুষের যে বিশাল ভাগের ওপর অন্য ছোট-বড় ভাগগুলো চেপে বসে আছে, কচ্ছপের কামড় বসিয়ে কিছুতেই ছাড়ছে না- পক্ষপাত কিছু থাকলে তাদের উল্টো দিকেই থাকা প্রয়োজন। তাহলে এটাই নিরপেক্ষতা। সকলের প্রতি পক্ষপাত এক রকম নিরপেক্ষতাই বটে।

কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ

এসবি/জেআর