রাত ৮:৩১ বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯


গণপিটুনির দায় কার

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : জুলাই ২২, ২০১৯ , ৯:১৪ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : আলাপচারিতা
পোস্টটি শেয়ার করুন

সাহেব-বাজার ডেস্ক : নানা ধরনের গুজব ছড়ানোর জেরে গত ৬ মাসে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৬ জন। এসব ঘটনাকে ‘হত্যা’ চিহ্নিত করে কোনও ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ এখন পর্যন্ত নেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এসব ঘটনার দায় কার?

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষা না করে নিজে থেকে পুলিশের উদ্যোগী হয়ে তদন্ত করে এসব ঘটনার বিচার করা জরুরি। আর মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, সমাজে অস্থিরতার কারণে জনপরিসরে কেউ কাউকে মারতে শুরু করলে সেটি সংক্রমিত হয় এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এটা মনস্তাত্ত্বিক সংকট। শাস্তির নমুনা পেলে মানুষ এ ধরনের ঘটনা থেকে দূরে থাকবে।

অবশ্য পর পর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার পর পুলিশ গণপিটুনিকে ফৌজদারি অপরাধ অভিহিত করে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে।
তবে পুলিশ সদর দফতর থেকে গণপিটুনির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তার তেমন কোনও কার্যকারিতা এখনও দেখা যাচ্ছে না।

গতকাল রবিবার (২১ জুলাই) দেশের তিন জায়গা থেকে গণপিটুনির খবর পাওয়া গেছে। এর আগে গত শনিবার (২০ জুলাই) ঢাকায় দুজন ও নারায়ণগঞ্জে একজন গণপিটুনিতে নিহত হন। ১৮ জুলাই নেত্রকোনায় নিহত হন দুজন। এরমধ্যে গণপিটুনির শিকার এক ব্যক্তির ব্যাগ থেকে একটি শিশুর মাথা উদ্ধার করা হয়েছে। ১৭ জুলাই চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে গণপিটুনির শিকার হন তিনজন।

এ রকম নানা ঘটনার হিসাব কষে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, গত ৬ মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে নিহত হয়েছেন ১৭ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৯।

পুলিশের প্রতি, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে মানুষ নিজেই বিচারকের স্থানে বসে পড়ে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক জিয়া রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দায় পুলিশের ওপর বর্তায়। তবে সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায় আছে। যে সমাজে জাস্টিস সিস্টেমের বিকাশ হয়নি সেসব সমাজে এমন ঘটনা ঘটে, এটাকে আমরা বলি ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের আগের পর্যায়।’

তিনি বলেন, এ ধরনের সমাজের মানুষ মনে করে, আইন নিজের হাতে না তুলে নিলে বিচার পাওয়া যাবে না। নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান নেওয়ার বিষয়গুলো একটি সমাজের মধ্যকার বিচার ব্যবস্থায় ছিল। একটি সমান্তরাল অনানুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থা।

অধ্যাপক জিয়া বলেন, ‘উন্নত দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে এর যথাযথ তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা করা হতো। অথচ এখানে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার পর এটা নিয়ে আর আলোচনা হয় না, এটা যে করা যায় না, তা বলা হয় না। ফলে দায়টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর যায়।’

পুরো বিষয়টার মধ্যে ক্রসফায়ারের সাইকোলজিক্যাল যে ভিত্তি সেটাই লুকায়িত বলে দাবি করে এই শিক্ষক বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মাইন্ডসেটে এই জিনিস আছে বলেই ক্রসফায়ার জায়েজ হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখনও সভ্য সমাজে জাস্টিস সিস্টেমের যে ব্যবহার, সেটার মধ্যেই পৌঁছতে পারিনি। আর পারিনি বলেই গণপিটুনির ব্যাপারটা রয়ে গেছে।’ কিন্তু এই যে বিচারের আওতায় আসা উচিত বলে আলাপ উঠছে সেটা খুব জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, সাধারণ নাগরিক করুক বা যেই এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত হোক না কেন, দায় রাষ্ট্রের। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের অঙ্গ হিসেবে পুলিশকে এই দায় নিতে হবে। কেননা, নিয়ম অনুযায়ী, প্রিভেনশন বা অ্যাকশন পাওয়ার পুলিশের। যখন ঘটনা ঘটছে তারা যদি তথ্য পায় সেটি সাধ্যমতো আটকানোর কাজটি কতটা করছে, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। ঘটনাস্থলে সবসময় পুলিশ নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে খবর পাওয়ার পর সে নিজে উদ্যোগী হয়ে তদন্তের ব্যবস্থা করছে কিনা।’

অনেক ক্ষেত্রে কেউ অভিযোগ দায়ের করছে না বলে পুলিশ অ্যাকশনে যায় না বলে উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, ‘পুলিশকে অভিযোগের জন্য অপেক্ষা কেন করতে হবে? এমন ঘটনা যেটা ম্যাজিস্ট্রেট থেকে নির্দেশ নিতে হবে না, সেসব ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা পুলিশ নিতে পারে। ক্রসফায়ার যখন যৌক্তিক করে তোলা হয়, তখন বিচার হবে না যুক্তি দিয়ে গণপিটুনির পেছনেও যুক্তি দেয় নাগরিক।’ এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এমনটা আরও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, একদিকে ছেলেধরার নাম করে কিংবা গাড়ি দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগী মানুষের সঙ্গে আশপাশের মানুষ যুক্ত হয়ে পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলছে, অন্যদিকে বেশ কয়েকটি প্রকাশ্য কোপানোর ঘটনায় আমরা আশপাশের মানুষজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে যখন নিরাপদ বোধ করে না এবং পুলিশি কাঠামো সুবিচার আনতে পারবে না, তখন নিজেদের ভেতরেই আদালত মানসিকতা তৈরি করে ফেলে। ‘মব’-এর একটা আলাদা চরিত্র আছে। রিফাত হত্যা বা অভিজিৎ রায়কে প্রকাশ্যে কোপানোর ঘটনায় পাবলিক নিজেদের সংযুক্ত বোধ করে না, কিন্তু ছেলেধরার গুজব বা রাস্তার যেকোনও দুর্ঘটনায় সে নিজেকে সম্পৃক্ত বোধ করে এবং তার ভেতর সেই সময়কার গণমানুষের সক্রিয়তার মানসিকতা সংক্রমিত হয়। সে সেখানেই বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।’
মব বা গণহামলায় সম্পৃক্তদের মধ্যে বিবেকবোধ কাজ করে না এবং তারা যেটা করছে সেটাই ঠিক বলে বিবেচনা করতে থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অবশ্য শনিবার (২০ জুলাই) পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল এবং গণপিটুনি দিয়ে মৃত্যু ঘটানো ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশ প্রত্যেকটি ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্তে নেমেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

এসবি/ এনএম