বিকাল ৫:২৭ বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯


একটি বাড়ি একটি খামারের আলোকে হাজার হাজার পরিবারকে রেশম উৎপাদনে যুক্ত করা সম্ভব: বাদশা

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : August 14, 2019 , 7:15 pm
ক্যাটাগরি : রাজশাহীর সংবাদ,শীর্ষ খবর,সাহেব-বাজার বিশেষ
পোস্টটি শেয়ার করুন

টানা তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশে ও দেশের বাইরে রাজনীতিক হিসেবে রয়েছে তার সুপরিচিতি। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়নের প্রশ্নে ফজলে হোসেন বাদশা বরাবরই সোচ্চার। এবারের ঈদের ছুটিতে সাহেব-বাজারের মুখোমুখি হয়ে তিনি কথা বলেছেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু নিয়ে। ধারাবাহিকভাবে আমরা তার সেই একান্ত সাক্ষাৎকার প্রকাশ শুরু করছি। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব।

সাহেব-বাজার: আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রশ্নে আপনি বরাবরই কথা বলেছেন। এখন যেটা হচ্ছে, সংসদ সদস্য হিসেবে আপনি উন্নয়নের বিষয়টি আরো গভীর থেকে দেখছেন। টানা তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন। নিশ্চয়ই এবারও নতুন কিছু ভাবনা আপনার রয়েছে। সেক্ষেত্রে শুরুতেই জানতে চাই, বিগত সময়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বর্তমানের কর্মকাণ্ডের তুলনামূলক বিবেচনায় নিজের অবস্থানটি কীভাবে বিবেচনা করছেন?

বাদশা: ২০০৮ সালের পর থেকেই আমার একটা পরিকল্পনা ছিলো। সেটি হলো রাজশাহীতে কীভাবে উন্নয়ন করবো। রাজশাহী ও পুরো উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের কোন পথে যেতে পারে এ বিষয়ে আমার বাস্তবমুখি একটা চিন্তা গড়ে উঠেছে। এখন অবশ্যই সেটির বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আমরা উত্তরবঙ্গকে একসময় মনে করতাম শস্যভাণ্ডার। আজকে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে উত্তরবঙ্গের কৃষকরা। বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে উত্তরবঙ্গের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং রাজশাহী বা উত্তরবঙ্গের কথা বললে এর সঙ্গে কৃষির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। রাজশাহীতে এখন প্রচুর মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। বিশ্বের মানচিত্রে মৎসখাতে উত্তরবঙ্গ একটা জায়গা করে নিয়েছে। সেটি দেশের উন্নয়নের একটি মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফল উৎপাদনে রাজশাহীর আম ও লিচুর কথা নতুন করে বলার নেই। সুতরাং বলা যায় রাজশাহী তথা উত্তরাঞ্চল বাংলাদেশের একটি খাদ্যভাণ্ডার। তাই সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই এখানকার উন্নয়নের বিষয়টি ভাবতে হবে।

রাজশাহীকে একটা সময় শিক্ষানগরী বলা হতো। এখনও তা আমরা দাবি করে থাকি। রাজশাহীকে যেন শিক্ষানগরী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, সংসদে সে দাবিও আমরা করেছি। আমি নির্বাচিত হওয়ার পর রাজশাহীর শিক্ষাঙ্গনে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছি। এর সুফল হিসেবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এখানকার শতভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে। এছাড়া নতুন বেশকিছু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠবে। এখানে সরকারি কলেজের সংখ্যা বেড়েছে। ভবিষ্যতে আরও কিছু কলেজের প্রয়োজন হবে আমাদের। তুলনায় স্কুলের সংখ্যা একটু কম। এটি আরও বাড়ানো দরকার। শিগগির রাজশাহীতে আরও বেশ কটি সরকারি স্কুল গড়ে উঠবে। সরকার তার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেগুলো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। রাজশাহীতে চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় পুরোদমে কাজ শুরু করতে চলেছে।

আরেকটা বিষয় উল্লেখ জরুরি। রাজশাহীকে বলা হয় সিল্কসিটি। এটি কিন্তু রাজশাহীর জন্য একটি ব্র্যান্ডিং। রাজশাহীকে সিল্কসিটি হিসেবে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে ব্র্যান্ডিং করেছি। আমাদেরকে একসময় বলা হয়েছিলো, রাজশাহীতে যে রেশম কারখানা রয়েছে তা িএকেবারে অচল। গত টার্মে আমাকে রেশম বোর্ডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সেই অচল বলে ঘোষণা দেয়া পুরনো রেশম কারখানাটিকে সচল করেছি। আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করে কারখানাটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছি।

সাহেব-বাজার: কিন্তু একসময় তো এটিকে বেসরকারি খাতে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিলো।

বাদশা: হ্যাঁ। আমি সেটাকে পরিকল্পনা নয়, বলতে চাই ষড়যন্ত্র। এটিকে বন্ধ করে দেয়ার কথা তোলা হয়েছিলো। কিন্তু আমি মনে করি, রাজশাহীর রেশম কারখানা কৃষির যে অর্থনীতি, তারই অংশ। এর বাইরে কিছু নয়। আমি মনে কির, রাজশাহী রেশম কারখানাকে আমরা যদি পুণজাগৃত করতে পারি তাহলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। একটি বাড়ি একটি খামারের আলোকে হাজার হাজার পরিবারকে রেশম উৎপাদনে যুক্ত করা সম্ভব। সেটি হবে তুঁত চাষে, সুতা তৈরিতে এবং তা কারখানায় পৌঁছে দেয়া থেকে। এর সাথে ভোলাহাট ও নাটোর পর্যন্ত যুক্ত করা যাবে। আমরা যদি রাজশাহীর হতদরিদ্র মানুষের ঘরে চরকা ও গুটি পোকা পৌঁছে দিই, তাহলে তারা ঘরে বসেই সুতা তৈরি করে কারখানায় সেটি পৌঁছে দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে।

সাহেব-বাজার: আপনি যখন নতুনভাবে কারখানা চালু করে নিজের উদ্যোগে এগিয়ে যেতে চাইছিলেন, তখন আমরা শুনেছিলাম, আন্তর্জাতিকভাবে অনেকের সহযোগিতা পাচ্ছিলেন না। পরিস্থিতি কি এখনো সেখানেই আছে, নাকি কিছুটা বদলেছে?

বাদশা: গত নির্বাচন পর্যন্ত আমি ধারাবাহিকভাবে রেশম কারখানার সঙ্গে ছিলাম। তখন রেশম বোর্ড ছিলো। কিন্তু পুণনির্বাচিত হওয়ার পর আমি সেই বোর্ডে আছি কি না এখন পর্যন্ত অবগত নই। সুতরাং আমি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখি যে, রেশম কারখানাটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার বিষয়ে এখানে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না।

আমি সোজাসুজি মনে করি, রেশম কারখাটিকে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর সাথে রাজশাহীর হতদরিদ্র মানুষকে যুক্ত করে এখানে নতুন অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। এখানে ঘরে ঘরে সুতা তৈরি করা সম্ভব। তাদের চাকরির প্রলোভন না দেখিয়ে কাজের সুযোগ দেয়া দরকার। সেই সুযোগ দেয়া সম্ভব। আমরা যদি বিনামূল্যে একটি চরকা দিতে পারতাম এবং গুটিপোকা দিতে পারতাম, তাহলে আমার মা বোনেরা ঘরে বসে সুতা তৈরি করে কারখানায় দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারতেন। এটি হলে আমাদের সরকারের নীতির সঙ্গেও তা সঙ্গতিপূর্ণ হতো। কিন্তু আমরা এখনও পর্যন্ত সেটি এগিয়ে নিতে পারিনি। কারণ নির্বাচনের পর প্রায় ছয় মাস পেরিয়েছে। েএখনও রেশম বোর্ড পুণর্গঠিত হয়নি। আমি যেহেতু রেশম কারখানাটিকে চালু করার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি, এখন আামি এখানে কী দায়িত্ব পালন করবো সে ব্যাপারে সরকারের কোনো নির্দেশনা এখনো পর্যন্ত আমি পাইনি।

সাহেব-বাজার: আপনি যদি বোর্ডে যুক্ত না থাকেন, তাহলে আপনার পরিকল্পনাটি ভেস্তে যাবার আশঙ্কা তৈরি হবে কি না?

বাদশা: আমি জানি না এর পরিণতি কী হবে। তবে আমি চাই রাজশাহীর রেশম কারখানাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হোক এবং রেশম নগরী হিসেবে রাজশাহীর যে পরিচিতি রয়েছে সেটি রক্ষা করা হোক। অথচ এখন খবরের কাগজে দেখছি, কারখানায় দুর্নীতি হচ্ছে। কিছু কর্মকর্তা লুটপাটে ব্যস্ত। এভাবে চলতে থাকলে এটা রাজশাহীবাসীর জন্য বড় হতাশার কারণ হবে।

আরেকটি বিষয় হলো, আমরা সংসদে তুলেছিলাম যে, ভাষা আন্দোলনে রাজশাহী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সেক্ষেত্রে আমরা চেয়েছিলাম রাজশাহীতে যে প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিলো, সেটিকে আবারও সুন্দর ও পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হোক। সেটি নির্মাণের জন্য আমি বড় অংকের অর্থও বরাদ্দ দিয়েছি। আমি মনে করি এর মাধ্যমে শহিদদের স্মৃতি বহন করা সম্ভব হবে। আমি সেই শহিদ মিনার নির্মাণের জন্য বলেছি যেন সেটি বায়ান্ন ফিট করা হয়। এতে করে শহিদ মিনারটি আমাদের বায়ান্ন সালের কথা মনে করিয়ে দেবে। এবং এই শহিদ মিনার যারা প্রথম নির্মাণ করেছিলেন, তাদের নামও সেখানে উল্লেখ থাকবে। কিন্তু সেই কাজ এখনো বেশিদূর এগোয়নি, অর্থ বরাদ্দের পরেও।

সাহেব-বাজার: কেন এমনটি হলো?

বাদশা: এর জবাব দিতে পারবে যে সংস্থা এর বাস্তয়বানের দায়িত্বে আছে, তারা।

সাহেব-বাজার: যারা ভাষাসৈনিক ছিলেন, তারা অনেকেই মারা গেছেন। কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু তাদের সবার মধ্যেই এ নিয়ে একটা আক্ষেপ আছে।

বাদশা: সৌভাগ্য এতোটুকুই যে আমরা যে শহিদ মিনার নির্মাণ করবো তার নকশা আমি গত তিন মাস আগে আমাদের ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপু সাহেবকে দেখিয়েছি। তিনি সেটি দেখেছেন এবং খুবই মুগ্ধ হয়েছেন। আমাদের রাজশাহীবাসীর সফলতা আপাতত এটুকুই যে আমরা তাদের কাছে শহিদ মিনারের নকশাটি পৌঁছাতে পেরেছি।

সাহেব-বাজার: কিন্তু তার থেকেও জরুরি হলো প্রথম শহিদ মিনারের স্বীকৃতি পাওয়া। সেদিকে কতটুকু এগুনো গিয়েছে?

বাদশা: আমরা যদি শহিদ মিনারটি তৈরি করে ফেলতে পারতাম, তাহলে সংসদে আমরা যারা আছি, তারা দাবি করে একটি স্বীকৃতি আদায় করে ফেলতে পারতাম, যে এটিই হলো বাংলাদেশের প্রথম শহিদ মিনার। সে বিষয়ে আমরা এখনও আশাবাদি। কারণ আমরা এখনো সংসদে রয়েছি। তাই আমরা আশা করি, শহিদ মিনারটি পুনর্নিমাণ করা গেলে অবশ্যই আমরা এর স্বীকৃতি পাবো।

এসবি/জেআর