রাত ১১:৫৪ বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯


অনলাইনের অপব্যবহারে শিশু যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কি করবেন? 

নিউজ ডেস্ক | সাহেব-বাজার২৪.কম
আপডেট : June 22, 2019 , 7:35 pm
ক্যাটাগরি : বর্ণবান
পোস্টটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছে। সরকার ইন্টারনেটের ব্যবহার মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ফলে কোন কিছু জানতে কারো কাছে হাত পেতে বসে থাকতে হচ্ছে না।

কম্পিউটার এবং ইান্টারনেট আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইান্টারনেটকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা এখন প্রায় অসম্ভব। সংবাদ, তথ্য, যোগাযোগ, কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিনোদন ইত্যাদি অনেক কিছুর জন্য মানুষ এখন ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেউ যদি ইন্টারনেটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ইন্টারনেটের কারণে যদি কারো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয় এবং সিগারেট, মদ ও ড্রাগের মত ইন্টারেনেটের প্রতি যদি কেউ আসক্ত হয়ে পড়ে তখনই সমস্যা।

আবার ইন্টারনেটের অপব্যবহার আমাদের জীবনের জন্য বিশেষ করে শিশুদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন শিশুরা পর্ণোসাইটের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক সময় শিশুরা না বুঝে নিজেদের ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করছে কিংবা তার কোন বিশ্বস্ত বন্ধুকে পাঠাচ্ছে। ঐ বন্ধুই সে ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করছে। ফলে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। অনেকে নিজেকে বাঁচাতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক শিশু অপরিচিত লোকের সাথে ফেসবুকে বন্ধুত্ব তৈরি করে। সেই বন্ধু বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করছে এবং গোপনে বা ফুসলিয়ে ভিডিও বা ছবি তুলে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, সাধারণত তিনটি উপায়ে শিশুরা ইন্টারনেটে যৌন হয়রানির শিকার হয়। সেগুলো হলো: সাইবার বুলিং, ফিশিং ও এডাল্ট কন্টেন্ট। এছাড়াও ইন্টারনেটে ওয়েবক্যামের মাধ্যমে শিশুদের যৌন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইন্টারনেটে নিষিদ্ধ বিষয়গুলো খুব সহজলভ্য হওয়ায় শিশুরা এর প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে নিজেরা যেমন যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তেমনি অন্যকেও যৌন নির্যাতন করছে। বাবা-মা ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ায় তারা অনলাইনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এক সময় নিজেরাই অপরাধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে। তাই বলে কি ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিতে হবে? না, বরং কীভাবে নিরাপদে আমাদের সন্তানরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করতে হবে।

যৌনতা প্রাণিজগতে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু সমস্যাটা তখনই হয়, যখন তা পর্ণোগ্রাফির মতো একটি বিষয়ে আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। আমাদের দেশে যৌনতা এখনও ট্যাবু।

কিন্তু এই ট্যাবু ভেঙ্গে বাবা, মা, শিক্ষক এবং বয়স্কদের উচিত শিশু কিশোরদের সঠিক তথ্য জানানো। শিশুরা যেন মোবাইল বা কম্পিউটারে সময় কাটানো অভ্যাসে পরিণত না করে সেদিকে অভিভাবককে সচেতন থাকতে হবে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, যারা বাড়িতে বেশি সময় কম্পিউটারে বসে সময় কাটান, তাদের মধ্যে পর্নো ফিল্ম দেখার প্রবণতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এর হাত থেকে শিশুদের বাঁচাতে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে, বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করাতে হবে।

শিশুরা যাতে নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে তার জন্য করণীয় : শিশুদের অনলাইনে যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বাবা-মাকে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্বপালন করতে হবে। কীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে সে বিষয়ে সন্তানকে সচেতন করতে হবে।

পারিবারিক সম্পর্ক বাড়াতে হবে। শিশুদের প্রতি কঠোর না হয়ে তাদের মনোভাব বুঝতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করানোর পূর্বে সন্তানকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। অপরের প্রতি সম্মানবোধ বাড়াতে হবে। ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় নির্ধারন করে দিতে হবে। ব্যবহৃত প্রযুক্তিটি বাসার কমন প্লেসে রাখতে হবে যাতে সন্তান কি করছে তা নজরে রাখা যায়। প্রয়োজনে সন্তানের সাথে আলোচনা করে তাদের ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যমের পাসওয়ার্ড জেনে নিতে হবে।

সন্তান কার সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব করছে বা চ্যাটিং করছে তা নজরে রাখতে হবে। মোট কথা অভিভাবককে অনলাইন কার্যক্রম ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে।

অভিভাবকের পাশাপাশি সরকারের দায়িত্ব অনেক। পর্ণোসাইট বিশেষ করে শিশু পর্নোসাইট বন্ধে সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৮ বছরের নিচে কেউ যেন পর্নোসাইটে প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। সাইবার অপরাধ আইন সম্পর্কে জনসাধারনকে সুস্পষ্ট ধারনা দিতে হবে। অনলাইনে শিশুদের উপযোগী বিনোদনমূলক কন্টেন্ট ও শিক্ষামূলক কন্টেন্টের অবাধ সম্ভার থাকতে হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় ইন্টারনেটের অপব্যবহার ও অনলাইনে শিশু নির্যাতন নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।

শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে কোথায় প্রতিকার পাওয়া যাবে সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে যাতে অভিযোগ করতে গিয়ে মানুষ হয়রানির শিকার না হয়। ইন্টারনেটের ক্ষতিকর সাইটগুলো ফিল্টারিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে অনলাইনে শিশু নির্যাতন ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার এবং সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিবারের সাথে আলোচনা, উঠান বৈঠক, জনসভা, মানববন্ধন, র‌্যালি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নাটক, প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, লিফলেট বিতরণ, অভিভাবক সমাবেশ, পাড়ায় পাড়ায় দলগঠন করে শিশুদের নিয়ে কাউন্সিলিং  করা খুবই জরুরী। এতে শিশুরা ইন্টারনেটের অপব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারবে।

ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সংবাদ মাধ্যম প্রতিনিধি হিসেবে আমাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা আনেকে এ বিষয়ে  কাজও শুরু করেছি। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া  ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধে গণসচেতনতা তৈরি, ঘটনার অনুসন্ধান ও ফলোআপ করে অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে উল্লেখিত বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রভাবক হিসাবে কাজ করতে পারে এবং একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর পাশে দাঁড়াতে পারে, তাকে সম্মানের সাথে সমাজে পুনর্বাসিত করতে সহায়তা করতে পারে। আমি প্রত্যাশা করি সংবাদ মাধ্যম প্রতিনিধিরা ইন্টারনেটের অপব্যবহারে শিশুদের যৌন নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে অধিকতর কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করবে।

আমাদের  শিশুদের একটি নিরাপদ, সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নির্মানের লক্ষ্যে, শিশুর প্রতি সকল প্রকার যৌন হয়রানি বন্ধ এবং নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহার অতি আবশ্যক। রাজশাহীতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নেতৃত্বে  অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট উল্লেখিত বিষেয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় ‘নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা বিষয়ক নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে’।

ওই নির্দেশিকাটি মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে  পাঠ দানের মাধ্যমে আমরা শিশুদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মানের শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি। যতদ্রুত সম্ভব এটা শুরু করা জরুরী। আশাকরি যথাযথ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

লেখক: শরীফ সুমন, সিনিয়র সাংবাদিক।